বাংলাদেশে টানা ৩ দফা ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা এখন গুগলের সার্চ ট্রেন্ডেই স্পষ্ট। কোন এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিতে—এ প্রশ্ন যেমন মানুষকে ভাবাচ্ছে, ঠিক তেমনি কৌতূহল বাড়ছে ভূমিকম্প ঠিক আগেভাগে জানা যায় কি না, তা নিয়েও।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিশ্লেষণে বাংলাদেশকে তিন ভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অংশ। সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুরের বেশ কিছু জেলা, ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল-গাজীপুর-নরসিংদীর অংশবিশেষ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি-রাঙামাটির উত্তরাংশ বড় মাত্রার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেন ভূতত্ত্ববিদরা।
যে কারণে এই অঞ্চলকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল’ ধরা হয়, তার মূল কারণ ডাউকি ফল্ট এবং সিলেট–টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত সাবডাকশন জোন। এই দুই উৎসে বহু বছর ধরে শক্তি জমা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার। তাঁর ভাষায়, ‘এই সেগমেন্টে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তি জমা আছে। এটা আজ হোক, কাল হোক—বের হবেই।’
মাধবদীতে সাম্প্রতিক কম্পনের উৎসও এই প্লেট সংযোগস্থলেই, যেখানে ভারতীয় প্লেট ধীরে ধীরে বার্মা প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনার একটি ইঙ্গিতবাহী ঘটনা।
অন্যদিকে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ থেকে শুরু করে রাজশাহী পর্যন্ত কিছু জেলা মাঝারি ঝুঁকিতে এবং খুলনা–বরিশাল অঞ্চলের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
ভূমিকম্পের পূর্বাভাস—সম্ভব?
মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—‘ভূমিকম্প কি আগে থেকে বলা যায়?’ উত্তরটি সরল এবং হতাশাজনক—না। কোথায় ঝুঁকি আছে, কত বছরের ব্যবধানে বড় ভূমিকম্প হতে পারে—এসব দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নির্ণয় করা গেলেও সুনির্দিষ্টভাবে ‘কখন, কোথায়, কত মাত্রার’ ভূমিকম্প হবে—এখনও বিশ্বের কোনো বিজ্ঞানীর পক্ষেই বলা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) আগেই জানিয়ে দিয়েছে—এই তিনটি তথ্য সঠিকভাবে একসঙ্গে পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি পৃথিবীর কোথাও নেই।
তবে বিজ্ঞান পুরোপুরি হাত গুটিয়ে বসে নেই। আগাম নয়, কিন্তু ভূমিকম্প শুরু হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগে সতর্কবার্তা পাঠানোর প্রযুক্তি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে এখন কার্যকর। এটি রিয়েল-টাইম অ্যালার্ট সিস্টেম—সিসমোমিটার কম্পন শনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজনকে সতর্কবার্তা পাঠায়।
আখতার বলেন, ‘এসব বার্তা সাধারণত ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড আগেই পাওয়া যায়।’ এই কয়েক সেকেন্ড কাউকে টেবিলের নিচে আশ্রয় নিতে বা ট্রেন থামানোর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়।
গুগলের সতর্কবার্তা—কতটা নির্ভরযোগ্য?
গুগল এখন বিশ্বজুড়ে অ্যান্ড্রয়েড ফোনকেই একটি ছোট সিসমোমিটারের মতো ব্যবহার করছে। ফোনে থাকা এক্সেলারোমিটার প্রথম কম্পন ধরলে সেটির তথ্য গুগলে পাঠায়। একই এলাকার বহু ফোন থেকে একই তথ্য এলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ব্যবহারকারীকে ‘ড্রপ, কাভার অ্যান্ড হোল্ড’ ধরনের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।
৯০টির বেশি দেশে এই ব্যবস্থা চালু থাকলেও বিশেষজ্ঞরা এটিকে সহায়ক মনে করলেও ‘পরিপূর্ণ ভূমিকম্প পূর্বাভাস’ বলে মনে করেন না। কারণ এটি ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পরের সেকেন্ডগুলোতেই তথ্য পাঠায়।
ভূমিকম্প কেন হয়
পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ অসংখ্য টেকটনিক প্লেটে বিভক্ত। এসব প্লেট চলমান, যার মিলনস্থলে বা সংঘর্ষের এলাকায় থাকে ফল্ট লাইন। এক প্লেট অন্যটির নিচে ঢুকে গেলে বা একটির চাপ অন্যটির ওপর বাড়লে প্লেটের নিচে শক্তি জমতে থাকে। নির্দিষ্ট বিন্দুতে সেই শক্তি সহনক্ষমতার বাইরে গেলে শিলা ভেঙে বা সরে গিয়ে শক্তি বেরিয়ে আসে—সেই মুহূর্তেই ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
ভূমিকম্পের সময় কী করবেন
ভূমিকম্প কখন হবে জানা না গেলেও প্রস্তুত থাকা ছাড়া বিকল্প নেই। ঘরে জরুরি কিট রাখা—খাবার, পানি, টর্চ, ওষুধ, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র—এসব রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম— “ড্রপ, কাভার অ্যান্ড হোল্ড” অর্থাৎ বসে পড়ুন, মাথা রক্ষার মতো আশ্রয়ের নিচে যান, এবং ঝাঁকুনি থামা পর্যন্ত সেখানেই থাকুন।
দৌড়ে বাইরে যাওয়া, জানালার কাছে দাঁড়ানো বা সিঁড়ি ব্যবহার করা—এসবকেই ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। বাইরে থাকলে বিদ্যুতের লাইন, গাছ, বিল্ডিং থেকে দূরে খোলা জায়গায় থাকা নিরাপদ।
ঝুঁকি কমানো সম্ভব শুধু প্রস্তুতি, পরিকল্পনা এবং নির্মাণশৈলীতে উন্নতির মাধ্যমে। প্লেটের নিচে জমে থাকা শক্তির হিসাব বিজ্ঞান দিতে পারে, কিন্তু কখন দরজা খুলে শক্তি বেরিয়ে আসবে তা কেউই বলতে পারে না। তাই ভূমিকম্প সচেতনতা এবং প্রস্তুতিই এখন বাস্তব নিরাপত্তার একমাত্র উপায়।
পতাকানিউজ/এনটি

