আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বেশ কিছু প্রস্তাব উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল—সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বিচারিক বা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানোর প্রস্তাব। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রতিনিধিরা যুক্তি দিয়েছেন, বিচারিক ক্ষমতা থাকলে তারা মাঠে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং যেকোনো পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে।
সোমবার (২০ অক্টোবর) নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত এ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। বৈঠকে ৪ নির্বাচন কমিশনার, ইসির সিনিয়র সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, এনএসআই, ডিজিএফআইসহ সব গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান বা প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে সশস্ত্র বাহিনীর একাধিক প্রতিনিধি বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে দায়িত্ব পালন করছে। তাই একই পদ্ধতিতে নির্বাচনেও তাদের সেই ক্ষমতা দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তারা প্রস্তাব করেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা বা প্রিসাইডিং কর্মকর্তা প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ডাকতে পারবেন—এমন বিধান আইনে স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হোক।
তবে নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে জানিয়েছে, প্রস্তাবটি আইনগতভাবে যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে। ইসি সচিব বলেন, ‘সেনাবাহিনী বর্তমানে ‘‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’’ কাঠামোয় কাজ করছে। আমরা এ নিয়ে বিভিন্ন মতামত পেয়েছি। আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) সংশোধনের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’
বৈঠকে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, অন্তত ৮ হাজার ভোটকেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, একটি চক্র নাশকতা ঘটিয়ে নির্বাচন ব্যাহত করার চেষ্টা করতে পারে। একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে থাকলেও প্রচারণা শুরুর পর অনলাইন অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।’ তারা নির্বাচন কমিশনকে জনগণের কাছে গিয়ে আস্থা অর্জনেরও পরামর্শ দেন।
বৈঠকে প্রস্তাব করা হয়, ভোটের আগে তিন দিন, ভোটের দিন এবং ভোটের পর চার দিন—মোট আট দিন মাঠে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য থাকবেন ৯০ হাজার থেকে এক লাখ। পুলিশের দেড় লাখ সদস্য, বিজিবি ও র্যাবের সদস্য ছাড়াও আনসার ভিডিপির প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ সদস্য দায়িত্বে থাকবেন।
পুলিশের মহাপরিদর্শক বৈঠকে জানান, পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হবে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব ভোটকেন্দ্রে প্রশাসনিক কাজে ড্রোন ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে প্রস্তাব করেন। তবে ইসি স্পষ্ট করে জানায়, নির্বাচনি প্রচারণায় কোনো পক্ষই ড্রোন ব্যবহার করতে পারবে না—শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে বাহিনী তা ব্যবহার করতে পারবে।
বৈঠকে প্রস্তাব করা হয়, সাংবাদিক ও নির্বাচনি পর্যবেক্ষকদের পরিচয়পত্রে কিউআর কোড যুক্ত করা হোক, যাতে দ্রুত যাচাই করা যায় কার্ডটি আসল কি না। একটি গোয়েন্দা সংস্থা কালোটাকা ব্যবহারের আশঙ্কা জানিয়ে সমন্বিত নজরদারির প্রস্তাব দেয়। অপর এক সংস্থা প্রার্থীর প্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্যদের নিয়ে কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা কমিটি গঠনের পরামর্শ দেয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বৈঠকে সব বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, ‘নির্বাচনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই হবে মূল দায়িত্ব। আগে গোপনে এক রকম নির্দেশনা, প্রকাশ্যে আরেক রকম ছিল—এখন তা আর হবে না।’
তিনি আরও বলেন, যেসব কর্মকর্তারা একই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের ভোটের আগে বদলি করতে হবে। বিশেষ করে আনসার বাহিনীতে পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিরা যেন দায়িত্ব না পান, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন সিইসি।
সোমবারের এই বৈঠক ছিল বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রথম উচ্চপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা সভা। এতে নির্বাচনি প্রস্তুতি, প্রযুক্তি ব্যবহার, মাঠপর্যায়ের সমন্বয় এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বহু দিক আলোচিত হয়েছে। ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব প্রস্তাব ও পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করে পরবর্তী বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সবশেষে ইসি সচিব বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে কোনো উদ্বেগ নেই। সবাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
নির্বাচনের আগে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এক প্রস্তাব। একদিকে তাৎক্ষণিক শৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তি থাকলেও অন্যদিকে এর আইনগত কাঠামো ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। নির্বাচন কমিশন যদি এ প্রস্তাব অনুমোদন দেয়, তবে তা বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ হতে পারে।
পতাকানিউজ/এনটি

