আগামী জাতীয় নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দেশের ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বুধবার, ২৬ নভেম্বর এক সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক এ তথ্য জানায়। এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ আদেশ নিয়ে ব্যাংকারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্দেশনা অযৌক্তিক। কয়েকজন ব্যাংককর্মীর সম্ভাব্য অনিয়মের ভিত্তিতে পুরো ব্যাংকিং কমিউনিটিকে একই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নিঃসন্দেহে অন্যায়।
বুধবার জারি করা সার্কুলারে বলা হয়, ‘ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী বিদেশ ভ্রমণে যেতে পারবেন না। তবে অপরিহার্য কারণে বিদেশ ভ্রমণ করা যাবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ আদেশ জারির ফলে যারা আগামী কয়েকমাসের মধ্যে নানা কারণে বিদেশ ভ্রমণের ছুটি নিয়েছিলেন এখন সব ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সেসব ছুটি বাস্তবায়নে নারাজ। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীরা মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের আদেশ, তাদের কিছু করার নেই।
ক্ষুব্ধ ব্যাংকাররা বলছেন, বিদেশ ভ্রমণ শুধু বেড়ানো নয় অনেকেই নিজের চিকিৎসা, পরিবারের স্বজনদের চিকিৎসা এবং পারিবারিক প্রয়োজনে বিভিন্ন দেশে যেতে হয়। এমন সার্কুলারের কারণে তাদের অনেক ক্ষতিই হবে।
ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে- পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ (বাংলাদেশের বাইরে) থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একান্ত অপরিহার্য কারণ ব্যতিরেকে ভ্রমণ পরিহার করতে বলা হয়েছে। অপরিহার্য কারণ বলতে যেসব মূল কারণ বোঝানো হয়, তা হলো- চিকিৎসা, তীর্থযাত্রা, জরুরি দাপ্তরিক প্রয়োজন ইত্যাদি।
একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের সময় ব্যাংকিং খাতে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে সম্ভাব্য শূন্যতা বা ব্যাঘাত এড়ানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, এটি ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিকতম একটি নির্দেশনা, যদিও পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞাগুলি প্রায়শই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত ছিল। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ব্যাংকের দায়িত্বশীল শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের নীতি হওয়া উচিত ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ন্যায্যতার ভারসাম্য বজায় রাখা, কিন্তু এই নির্দেশনা সেই নীতিকে ক্ষুণ্ণ করছে। ব্যাংকারদেরও পারিবারিক দায়িত্ব, শিশুদের প্রয়োজন, স্বাস্থ্যপরীক্ষা, জরুরি ভ্রমণ কিংবা ব্যক্তিগত গুরুত্বপূর্ণ কারণ থাকতে পারে। এমন অবস্থায় হঠাৎ করে বিদেশভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ।
৪টি তফসিলি ব্যাংকের চট্টগ্রামের কর্পোরেট শাখার উল্লেখযোগ্য কর্মকর্তারা জানান, এ ধরণের পদক্ষেপ পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের ঢালাও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ নীতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। যেখানে ব্যক্তিকে নয় বরং পুরো জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো। তারা অভিযোগ করে বলেন, কোনো খাতে কিছু অনিয়ম থাকতেই পারে, কিন্তু তার সমাধান লক্ষ্যভিত্তিক হওয়া উচিত, সামগ্রিক দমন নয়। ব্যাংক কর্মীদের প্রতি এমন অবিশ্বাস সৃষ্টি করলে কর্মপরিবেশও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে। এর ফলে সেবার মান, মনোবল ও কর্মদক্ষতা—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, একটি গণতান্ত্রিক ও আধুনিক রাষ্ট্রে নীতিমালা এমন হতে হবে যা ব্যক্তির মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষা করে। পুরো ব্যাংকিং খাতকে দোষী বানিয়ে শাস্তি দিয়ে সমস্যা সমাধান নয়; বরং সুনির্দিষ্ট তদন্ত, সঠিক নজরদারি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকৃত সমস্যাগুলো মোকাবিলা করাই যুক্তিসঙ্গত পথ। তাই এই নির্দেশনাটি পুনর্বিবেচনা করা সময়ের দাবি, যাতে কর্মীদের অধিকার ও রাষ্ট্রের স্বার্থ—উভয়ই সুরক্ষিত থাকবে।
পতাকানিউজ/কেএস

