টানা বৃষ্টিতে চা বাগানের প্লান্টেশন এলাকায় চা গাছের উপকার হলেও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে কারখানায় চা উৎপাদন ক্ষতির মুখে পড়েছে। মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানে বিদ্যুৎ সমস্যায় উত্তোলিত চা পাতা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারেনি কারখানাগুলো। এমন অবস্থায় দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ চা শিল্পের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
দেশের মোট চা উৎপাদনের বড় একটি অংশই আসে এ জেলার ৯২টি চা বাগান থেকে—যার মধ্যে রয়েছে ৫টি সরকারি চা বাগান। তবে ঘনঘন লোডশেডিং আর কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে টানা ৪-৫ দিনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে এ সম্ভাবনাময় শিল্প চরম সংকটে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় থমকে গেছে চা উৎপাদন। বিশেষ করে সরকারি মালিকানাধীন ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) পাঁচটি চা বাগানে টানা ৫ দিন বন্ধ ছিল কারখানার কার্যক্রম। এ অবস্থায় উত্তোলিত কাঁচা চা পাতা অনেকটাই বিনষ্ট হয়ে গেছে।
সরেজমিন চা উৎপাদন কারখানাগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, বাগানগুলোতে মজুদ রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কেজি কাঁচা চা-পাতা। যেখান থেকে উৎপাদনের কথা ছিল প্রায় ৬০ হাজার কেজি চা। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সংরক্ষণ করা এ পাতাগুলো এখন পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে করে চা শিল্পে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আয়। শুধু সরকারি বাগানই নয়, ব্যক্তি মালিকানাধীন, ব্রিটিশ মালিকানাধীন ডানকান ব্রাদার্সের চা বাগানগুলোর অবস্থাও প্রায় একই।
ন্যাশনাল টি কোম্পানির মাধবপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক দিপন কুমার সিংহ ও চাম্পারায় চা বাগান ব্যবস্থাপক রায়েল রানা বলেন, ‘সরকারি ৫টি চা বাগানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে উৎপাদন। বাগানগুলোতে মজুদ রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কেজি কাঁচা চা পাতা—যেখান থেকে উৎপাদনের কথা ছিল প্রায় ৬০ হাজার কেজি চা। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটে সেই কাঁচা পাতাগুলোই এখন পচে নষ্ট হচ্ছে। এতে করে চা শিল্পে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। ক্ষতির মুখে পড়ছে সরকারও—কমছে রাজস্ব আয়।
তিনি বলেন, ‘শুধু সরকারি বাগান নয়—ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানগুলোর অবস্থাও একই। কারখানার চাকা থমকে থেমে গেছে, বন্ধ হয়ে আছে উৎপাদন।’
ন্যাশনাল টি কোম্পানির পাত্রখলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ খাঁন বলেন, ‘এপ্রিল মাসের শুরুতেই প্রতিদিন গড়ে ৫–৭ ঘণ্টা লোডশেডিং। কিন্তু ২৬ এপ্রিল থেকে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে। বর্তমানে দিনে মাত্র ১–২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এ দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। জ্বালানির ঘাটতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে প্রায় ১ লাখ ৮হাজার কেজি কাঁচা চা পাতা মাচায় পড়ে রয়েছে, যা দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এ অবস্থায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’
ডানকান ব্রদার্সের মালিকানাধীন আলীনগর চা বাগান ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম রানা বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে উত্তোলিত অনেক কাঁচা চা-পাতা বিনষ্ট হয়েছে। তবে জেনারেটর সুবিধা থাকায় কিছুটা স্বাভাবিক উৎপাদন চালু রাখা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কমলগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিজিএম প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার ঘোষ বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন ঝড়-তুফানের কারণে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষতি পুষিয়ে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখতে সময় লেগেছে। বিদ্যুৎ লাইন স্বাভাবিক রাখতে এবং দ্রুত পুনরায় চালু করার জন্য বিদ্যুৎ কর্মীরা দিন-রাত কাজ করে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে।’
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ধীরে ধীরে সব এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে। অতিরিক্ত গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তবে দ্রুত পুরো উপজেলার বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে।’
পতাকানিউজ/এমআরআর/আরবি

