গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি ‘নির্লজ্জভাবে লঙ্ঘনের’ দায়ে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসকে অভিযুক্ত করে রবিবার (১৯ অক্টোবর) বিমান হামলা চালানোর পর আবারও যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের জবাবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
রবিবার দক্ষিণ গাজার রাফায় ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবর্ষণ করা হয় এবং তাতে দুই সেনা নিহত হন—এমন অভিযোগ তোলার পরই হামলা শুরু করে ইসরায়েল।
হামাস বলেছে, ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় কোনো সংঘর্ষের বিষয়ে তারা অবগত নয়।
রবিবার সন্ধ্যার মধ্যে ইসরায়েল জানায়, তারা গাজা জুড়ে হামাসের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, এতে ৪৪ জন নিহত হয়েছেন।
হামাস বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, কিন্তু ইসরায়েলকে চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, এই হামলা পরিস্থিতিকে ‘সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার’ দিকে ঠেলে দিতে পারে।
স্থানীয় সময় রাত ৯টার পর ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, তারা ‘যুদ্ধবিরতি পুনরায় কার্যকর করা শুরু করেছে’। তারা চুক্তি মেনে চলবে এবং ‘যেকোনো লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে জবাব দেবে’ বলে জানিয়েছে।
তবে গাজায় সাহায্য প্রবেশে বাধা দেওয়ার পূর্বের ঘোষণা প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না, তা বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপে যুদ্ধ বন্ধ, গাজার উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণে তথাকথিত হলুদ রেখায় ইসরায়েলি সেনাদের আংশিক প্রত্যাহার এবং সাহায্য বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়।
হামাস জীবিত সব জিম্মিকে মুক্ত করেছে এবং ২৮ জন মৃত জিম্মির মধ্যে ১২ জনের দেহ ফিরিয়ে দিয়েছে।
ইসরায়েল তার কারাগারে থাকা ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দী এবং গাজা থেকে আটক ১ হাজার ৭১৮ জনকে মুক্ত করেছে। প্রতিটি ইসরায়েলি জিম্মির দেহের বিনিময়ে ১৫টি ফিলিস্তিনির মরদেহ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহে মিসরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে বিশ্বনেতারা ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি’ স্লোগানের ব্যানারে সমবেত হওয়ার পর এটি ছিল গাজায় সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংস দিন।
এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি টিকিয়ে রাখতে এখন মার্কিন চাপ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার শিগগিরই ইসরায়েল সফরে যাচ্ছেন।
রবিবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, ‘রাফাহ এলাকায় সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংসের জন্য কাজ করা আইডিএফ সেনাদের দিকে সন্ত্রাসীরা অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল ও গুলি ছুড়েছে।’
জবাবে, আইডিএফ হুমকি দূর করতে এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্য ব্যবহৃত টানেল শ্যাফট ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে এলাকায় হামলা শুরু করেছে।
হামাসের সামরিক শাখা আল-কাসাম ব্রিগেড রাফাহ এলাকায় কোনো সংঘর্ষের বিষয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চলতি বছরের মার্চে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানে আমাদের অবশিষ্ট গ্রুপগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাই, সেখানে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, এবং আমাদের কোনো যোদ্ধা সেখানে জীবিত থাকলেও তাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করতে পারছি না।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, রাফাহ’র ‘দুঃখজনক ঘটনায়’ দুজন সেনা—মেজর ইয়ানিভ কোলা এবং সার্জেন্ট ইতায় ইয়াভেতজ—নিহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বিবিসিকে জানান, উপকূলে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের আলো জ্বলে উঠেছিল এবং শক্তিশালী গৌণ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
আল-জাওয়াইদা হামলায় নিহত ছয়জন ছিলেন আল-কাসাম ব্রিগেডের সদস্য, বলে স্থানীয় সূত্র জানায়।
তাদের মধ্যে ছিলেন জাবালিয়া ব্যাটালিয়নের হামাসের অভিজাত ইউনিটের কমান্ডার ইয়াহিয়া আল-মাবহুহ। তার মৃত্যু যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর হামাসের অন্যতম বড় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, নুসেইরাতের আল-আওদা হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, বাস্তুচ্যুত পরিবারের আশ্রয় নেওয়া একটি স্কুলে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৪টি মৃতদেহ আনা হয়েছে।
চিকিৎসক জানান, হতাহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী ও শিশু রয়েছে।
ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ২০-দফা যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে হামাসকে তার অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে, যাতে তারা ইসরায়েলের জন্য আর হুমকি না হয়।
হামাস অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল গাজা উপত্যকার ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত অংশে লুটেরা দলকে অস্ত্র সরবরাহ করছে, যারা নির্বিঘ্নে কাজ করছে।
১৮ বছর ধরে গাজা শাসনকারী হামাস আবু শাবাবের পপুলার ফোর্সেসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যাদের তারা বলছে ইসরায়েল অস্ত্র ও সমর্থন দিচ্ছে।
রোববার সকালের ঘটনা সম্পর্কে জানা একটি স্থানীয় সূত্র বিবিসিকে জানায়, হামাসের যোদ্ধারা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণ-পূর্ব রাফাহ’তে আবু শাবাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালায়।
জানা গেছে, মিলিট্যান্টরা অতর্কিত ট্যাঙ্কের গোলাবর্ষণের মুখে পড়ে, যার ফলে সংক্ষিপ্ত গোলাগুলির পর ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান সেখানে বোমা হামলা চালায়।
একজন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা পরে জানান, ‘হামাস হলুদ রেখার পিছনে দাঁড়ানো আমাদের সেনাদের দিকে কমপক্ষে তিনবার গুলি চালিয়েছে।’ তিনি বলেন, এই হামলা ‘কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।’
আইডিএফ বাহিনী এখনও গাজার ৫০ শতাংশের বেশি এলাকা দখল ও নিয়ন্ত্রণ করছে।
রাফাহ’র হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, তাদের কাছে ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন’ রয়েছে যে হামাস গাজায় বেসামরিক লোকদের ওপর ‘আসন্ন’ হামলার পরিকল্পনা করছে, যা যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘প্রত্যক্ষ ও গুরুতর’ লঙ্ঘন হবে।
একটি পরিকল্পিত হামলা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জিত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিকে ব্যাহত করবে,’ বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়।
হামাস কোনো আসন্ন হামলার পরিকল্পনা থাকার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।
এক সপ্তাহ আগে গাজা শহরে হামাস নিরাপত্তা বাহিনী এবং দুগমুশ পরিবারের সশস্ত্র সদস্যদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষে ২৭ জন নিহত হয়।
ট্রাম্প এর আগে হামাসকে বেসামরিক নাগরিক হত্যার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন।
“যদি হামাস গাজায় মানুষ হত্যা চালিয়ে যায়, যা চুক্তির অংশ ছিল না, তাহলে আমাদের কাছে তাদের হত্যা করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না,” প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সপ্তাহের শুরুতে ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে বলেন। পরে তিনি স্পষ্ট করেন, তিনি গাজায় মার্কিন সেনা পাঠাবেন না।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার জবাবে গাজায় অভিযান শুরু করে, যেখানে হামাস-নেতৃত্বাধীন বন্দুকধারীরা দক্ষিণ ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষকে হত্যা করে এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে।
হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তখন থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় কমপক্ষে ৬৮,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে, যার তথ্য জাতিসংঘ নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে।
সূত্র: বিবিসি
পতাকানিউজ/এনটি

