নিরাপত্তাজণিত কারণে ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) গত ২৪ জানুয়ারি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেয়। এরপর স্কটল্যান্ডকে আমন্ত্রিত অতিথি বানিয়ে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ মাঠে গড়ায় আইসিসি।
কিন্তু বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে নিয়ে খেলার খেলার মাঠে বোলিং শুরু হলেও আচমকা লাইটলাইন থেকে পাল্টা ফার্স্ট বোলিং শুরু করে পিসিবি। সেই বোলিং সরাসরি খেলার মাঠে না হলেও একেবারে গাঁয়ে আঁচড় কেটেছে আইসিসির। পিসিবির এমন ধারালো বোলিং ছিল যা ছক্কা হাঁকাতে পারেনি আইসিসি। উল্টো কপোকাত হয়ে ধর্ণা দিতে হয়েছে পিসিবির কাছে। প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়ে আইসিসি রীতিমতো বিসিরি সঙ্গে বৈঠকে বসতে বাধ্য হয়।
সেই কারণেই দ্রুত পাকিস্তানে উড়ে যান বিসিবি সভাপতি আমিনুল হক। সেখানেই চলে আইসিসি পিসিবি এবং বিসিবির ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। ওই বৈঠকের আলোচ্য বিষয়ে আইসিসি ইতিবাচক হলে আজ আবারও বৈঠক হতে পারে।
কী এমন সিদ্ধান্ত হলো বৈঠকে? তাই উঠে এসেছে পাকিস্তান এবং ভারতের গণমাধ্যমে। গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ড আমন্ত্রণ জানানোর পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় ১ ফেব্রুয়ারি। যখন পাকিস্তান সরকার বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দেয়। এতে চাপের মুখে পড়ে আইসিসি, আর সেই প্রেক্ষাপটেই রোববার পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) সঙ্গে জরুরি বৈঠকে অংশ নিতে লাহোরে যান আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজা।
আইসিসির প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে পৌঁছানোর আগেই একই দিন সকালে লাহোরে উপস্থিত হন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি আমিনুল ইসলাম। প্রথমে পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন আমিনুল। এরপর যোগ দেন আইসিসি–পিসিবির ত্রিপক্ষীয় আলোচনায়। বৈঠক শেষে গতকাল রাতেই পাকিস্তান ত্যাগ করেন বিসিবি সভাপতি।
পাকিস্তানি গণমাধ্যমে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ
পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভারত-ম্যাচ বয়কট নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশ ইস্যুও ছিল বৈঠকের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে আইসিসি ও বিসিবির মধ্যকার আলোচনায় পিসিবি সমন্বয়কারীর ভূমিকায় ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
জিও টিভির অনলাইন প্রতিবেদনে বলা হয়, আইসিসির কাছে বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরেছে বিসিবি। আইসিসি এসব দাবির বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং বিসিবির উত্থাপিত অভিযোগগুলো সমাধানের জন্য একটি সম্ভাব্য ‘ফর্মুলা’ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আইসিসি ও বিসিবি নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন প্রস্তাব বিনিময় করেছে। দীর্ঘ বৈঠকের পর ইমরান খাজা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আইসিসি সদর দপ্তরে ফিরে গেছেন। অন্যদিকে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
সূত্রটি জিও টিভিকে জানায়, প্রস্তাবিত ফর্মুলা নিয়ে উভয় পক্ষ একমত হলে পরবর্তী পদক্ষেপ চূড়ান্ত করতে আইসিসি ও বিসিবির কর্মকর্তারা আবার বৈঠকে বসবেন।

ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় কী হয়েছে?
পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানায়, ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ‘ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে’ ভারত ম্যাচ নিয়ে পিসিবিকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন করে দুই বোর্ডকে আশ্বস্ত করেন যে তাদের উদ্বেগ দূর করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আইসিসির রাজনীতি ও ভারতের প্রভাব—ডনের দাবি
প্রভাবশালী পাকিস্তানি দৈনিক দ্য ডন তাদের প্রতিবেদনে জানায়, বৈঠকে পিসিবি আইসিসির কর্মকাণ্ডে ‘ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব’ এবং এতে ভারতের ‘অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ’ প্রসঙ্গ তুলে ধরে। সংবাদমাধ্যমটি জানায়, আইসিসি বাংলাদেশকে আলাদা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি নাকচ করলেও নিশ্চিত করতে চায়, রাজস্ব বণ্টনে বাংলাদেশ যেন তাদের পূর্ণ অংশ পায়।
বিসিবির দাবি কী?
ভারতের এনডিটিভি জানিয়েছে, আইসিসির কাছে বাংলাদেশ ইস্যুতে তিনটি নির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়েছে—
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিতে না পারার কারণে বর্ধিত ক্ষতিপূরণ
বিশ্বকাপের অংশগ্রহণ ফি নিশ্চিত করা
ভবিষ্যতে একটি আইসিসি টুর্নামেন্ট আয়োজনের স্বত্ব প্রদান
ক্রিকেট রাজনীতির নতুন সমীকরণ?
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শক্তির ভারসাম্য ও বোর্ডগুলোর প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়া, পাকিস্তানের অবস্থান এবং আইসিসির মধ্যস্থতা—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক ক্রিকেট প্রশাসনের ভেতরের কূটনীতি এখন স্পষ্টভাবে সামনে চলে এসেছে।
এমন কূটনীতিতে ভারতের অবস্থান এখনো প্রকাশ্যে না এলেও ভারত তার দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ছেলে জয় শাহকে আইসিসির চেয়ারম্যান পদে বসিয়ে ইচ্ছেমতো খেলছে বলে অভিযোগ আছে। জয় শাহ আইসিসির ক্রিকেট স্বার্থের চেয়ে ভারতীয় রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেন বলে যে অভিযোগ ক্রিকেট বিশ্বে উঠছে- তা নিয়ে আইসিসি কিংবা জয় শাহ এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
সূত্র : দ্যা ডন, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন এবং এনডিটিভি
-পতাকানিউজ

