এইচএসএসসি’র ফলাফল নিয়ে সারাদেশে তোলপাড়। এবারের ফলাফলে পাসের সংখ্যা কমেছে। জিপিএ-৫ তো নেই বললেই চলে। বিশেষ করে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে ফলাফলে বেশি বিপর্যয় ঘটেছে। একই অবস্থা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ক্ষেত্রেও।
তবে ফলাফলে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের মো. রিপন মিয়া। বেকারি শ্রমিকের কাজ ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে এসে মাত্র ৬ মাস পড়াশুনা করে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। নবীনগর সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে সে-ই একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী।
এইচএসসি পড়াকালীন প্রায় এক বছর বেকারি শ্রমিকের কাজ করেছে রিপন। পরীক্ষার প্রায় ছয় মাস আগে বাড়ি আসেন। কলেজ হোস্টেলে কাটে তিন মাস। আর্থিক অনটনে ফের বাড়িতে চলে আসা। এবার ভাইয়ের পুড়ি, সিঙ্গারার দোকানে কাজে যোগ দেয়। পড়াশুনাও চলছিল। শেষ পর্যন্ত ফলাফলে বেশ চমকে দিয়েছে রিপন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থেকে নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের দূরত্ব ২০ কিলোমিটারের বেশি। কৃষ্ণনগর বাজার থেকে নবীনগর যাওয়ার পথে দৌলতপুর বাজারে প্রায় ২০ মিনিট হেঁটে যেতে হয় রিপনদের বাড়িতে। শনিবার, ১৮ অক্টোবর দুপুরে জমির আইল ধরে চলার পথে রিপন জানায় তার সাফল্যের গল্প গাঁথা।
রিপন বলেন, ‘প্রায় ২ বছর আগে যখন ভাইয়ের সঙ্গে চাঁদপুরে চলে যাই তখন পড়াশুনা আর হবে না বলেই ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার পরিচিতজন নবীনগরের গুঞ্জন পাঠাগারের পরিচালক শিক্ষক স্বপন মিয়া আমাকে পড়ার বিষয়ে তাগাদা দেন। এসএসসি’র মতো এইচএসসিতে আমি ভালো করতে পারবো বলে অভয় দেন। এরই মধ্যে আমার ভাই রিফাত মিয়া অনেক চেষ্টা করে স্বপন স্যারের সহযোগিতায় আমাকে নবীনগর সরকারি কলেজে ভর্তি করান।’
রিপন আরও বলেন, ‘পরীক্ষার প্রায় ৬ মাস আগে বাড়িতে এসে পড়াতে মনোযোগী হই। কিছুদিন গুঞ্জন পাঠাগারে থাকি। এরপর কলেজ হোস্টেলে। কিন্তু টাকার অভাবে পরীক্ষার তিন মাস আগে হোস্টেল ছেড়ে বাড়ি চলে আসি। এরপর ভাইয়ের সঙ্গে সিঙ্গারা, পুরির দোকানে কাজ করার পাশাপাশি পড়াশুনা করতে থাকি। দৈনিক আট-১০ ঘণ্টা পড়েছি। একজন শিক্ষক আমাকে বিনা পয়সায় ইংরেজি পড়িয়েছেন।’
চার ভাইয়ের মধ্যে রিপন তৃতীয়। বড় ভাই সংসারের হাল ধরতে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরুনোর আগেই প্রবাসে পাড়ি জমায়। সম্প্রতি সেখানে ব্যবসায় বড় ধরনের ধাক্কা খান তিনি। পরিবারটিতে নেমে আসে আর্থিক অনিশ্চয়তা। বাবা খলিল মিয়া ইজারা নেয়া ছোট্ট বিলের আয় থেকে কোমো রকমে সংসার চালান। আরেক ভাই রিফাত মিয়া খোলেন পুরি সিঙ্গারার দোকান। মূলত রিফাতের সঙ্গেই চাঁদপুরে থাকতো রিপন।
রিফাত মিয়া জানায়, এসএসসিতেও জিপিএ-৫ পায় রিপন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা চিন্তা করে তখন তাকে চাঁদপুরে নিয়ে বেকারির কাজে লাগানো হয়। কিন্তু রিপন মনমরা থাকতো। শিক্ষক স্বপন মিয়ার অনুরোধে রিপনকে বাড়িতে পাঠায়। এরই মধ্যে তাকে নবীনগর সরকারি কলেজে ভর্তি করানো হয়। এই কলেজ থেকে রিপনই একমাত্র শিক্ষার্থী যে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
রিফাত মিয়া বলেন, ‘বেকারিতে চাকরি করা অবস্থায় আমিও এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। পরীক্ষার দিনও ভ্যান দিয়ে পণ্য পৌঁছানোর পর হলে গেছি। না খেয়ে পরীক্ষা দিতে গেছি। তারপরও মোটামুটি ভালো ফল করেছি। এরপর আর পড়াশুনা হয়নি। রিপনকেও এভাবেই পড়াবো ভেবেছিলাম। কিন্তু স্বপন স্যারের অনুরোধে তাকে বাড়িতে পাঠাই। মাত্র ছয়মাস পড়ে আমার ভাই এত ভালো ফল করেছে। আমরা এটা চিন্তাও করতে পারিনি। রিপনের ফলাফল দেখে আমিও চিন্তা করছি অনার্স কিংবা ডিগ্রিতে ভর্তি হবো। আমার ছোট ভাই এবার এসএসসি পাস করলেও অর্থের অভাবে পড়ানো যাচ্ছে না। তাকেও পড়ানোর চিন্তা করছি।’
রিফাতের বাবা মো. খলিল মিয়া তার মেধাবী এ ছেলের উচ্চশিক্ষা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘লেহাপড়া অত আমি বুজি না। ত আমার পুলা ভালা রেজাল করছে। আরো ভালা করুক ইডা আমার আশা। কিন্তু উপরে পড়ানোর মতো সুবিধা আমার নাই। যদি সমাজের লোকজন আর আফনেরা (সাংবাদিক) কিছু একটা করতারেন তাইলে আমার পুলার জীবনডা কাজে লাগবো।’
শঙ্কার কথা জানালেন খোদ রিপনও। পতাকা নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া। কিন্তু এখানে পড়তে যে খরচ হবে সেটা আমার পরিবার দিতে পারবে না। আমি বাড়ি থেকে চলে গেলে দোকানেরও সমস্যা হবে। কিভাবে কী করবো বুঝতে পারছি না।’
রিপনদের আত্মীয় ও প্রতিবেশী মো. বরকত উল্লাহ বলেন, ‘রিপনের সাফল্যের কথা শুনে ভালো লাগছে। সে যদি ২ বছর পড়ার সময় পেতো তাহলে আরো ভালো ফলাফল করতো। আমরা চেষ্টা করছি রিপনের ভর্তির টাকাটা আপাতত ম্যানেজ করে দেয়ার জন্য।’
কলেজ শিক্ষক ও বই মজুর হিসেবে পরিচিত স্বপন মিয়া বলেন, ‘রিপন অসম্ভব মেধাবী। পরীক্ষার ৬ মাস আগেও সে বেকারিতে কাজ করেছে। পরীক্ষা দিতে পারবে বলেই মনে হচ্ছিলো না। এ অবস্থায় তাকে বলার পর বাড়িতে আসে। এখানেও সে দোকানের কাজে সহায়তা করে। এতকিছুর পরও তার এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। তবে তার উচ্চ শিক্ষার জন্য সমাজের দয়াশীল মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
পতাকানিউজ/বিপিবি/এমওয়াই

