বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় মুস্তাঈন বিল্লাহ সাব্বির নামে এক ব্যক্তি আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা হত্যাচেষ্টার মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন জাকির হোসাইন গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেন।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের ওপর শুনানির জন্য কলিমুল্লাহকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত ওই আবেদন মঞ্জুর করেন।
ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের উত্তরা পশ্চিম থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা এস আই হেলাল উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা উত্তর পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক মো. আবু সাঈদ গত ২৮ জুলাই আসামি কলিমউল্লাহকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত বৃহস্পতিবার শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেন।
গ্রেফতার দেখানোর আবেদনে বলা হয়, হাজতি আসামি কলিমউল্লাহ এই মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত আছেন মর্মে যথেষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমানে তিনি জেল হাজতে আটক থাকায় তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন। মামলাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে, তদন্তকার্য সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত কলিমউল্লাহকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভিকটিম মুস্তাঈন বিল্লাহ সাব্বির অংশ নেন। ওই বছর ১৯ জুলাই বিকেলে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন রবীন্দ্র স্বরনী রোড এলাকায় অবস্থান কালে তিন গুলিবিদ্ধ হন। একটি গুলি তার বাম হাতের কুনই এর মাঝখানে লেগে বিপরীত পাশে বের হয়ে যায় এবং গুরুতর জখম প্রাপ্ত হন। উপস্থিত লোকজন তাকে উত্তরা হাইকেয়ার জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (নিটোর) নিয়ে যান।
পরবর্তীতে সুস্থ হয়ে মুস্তাঈন বিল্লাহ সাব্বির বাদী হয়ে উত্তর পশ্চিম থানায় হত্যাচেষ্টা মামলাটি দায়ের করেন।
২০২৫ সালের ৭ আগস্ট মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক এই ভাইস চ্যান্সেলরের (ভিসি) বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলায় ওইদিনই তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। সম্প্রতি তাকে ওই মামলায় হাইকোর্ট জামিন দেন। গত ২৭ জুলাই সোমবার তাঁর পক্ষে আদালতে জামিননামা দাখিল করা হয়।
তিনি মুক্তি পাওয়ার আগেই আরেক মামলায় গ্রেপ্তারের আবেদন করায় তাঁর কারামুক্তি আটকে যায়। আর গ্রেপ্তার দেখানোর ফলে এই মামলায় যাবেন না হওয়া পর্যন্ত তিনি কারাগারে আটক থাকবেন।

জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন দাবি কলিমুল্লাহর
২০২৪ সালের জুলাইতে শুরু হয় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে বেরোবির সাবেক উপাচার্য কলিমুল্লাহ সমর্থন করেছেন বলে আদালতের কাছে দাবি করেন।
শুনানির একপর্যায়ে কলিমুল্লাহ বলেন, ‘রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার প্রথম প্রতিবাদ আমিই করেছি। আমিই প্রতিবাদ জানিয়েছি সবার আগে। এটা রেকর্ড আছে। জুলাই আন্দোলনে আমি কোথাও বিপক্ষে কাজ করিনি। আমি আন্দোলন সমর্থন করেছি।’
সকালেই কলিমুল্লাহ কে কারাগার থেকে আদালতের হাজতখানায় নিয়ে আসা হয়। দুপুরে আদালতের হাজতখানা থেকে তাকে এজলাসে ওঠানো হয়। নেওয়া হয় আদালতের কাঠগড়ায়। কিছুক্ষণ পরেই শুনানি শুরু হয়।
প্রথমে কলিমুল্লাহকে গ্রেপ্তার দেখানোর সমর্থনে তদন্ত কর্মকর্তা এস আই মো. আবু সাইদ বক্তব্য রাখেন।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক অধ্যাপক। এসময় কলিমুল্লাহ প্রতিবাদ করে বলেন, সাবেক না, সাবেক না। আমি এখানো অধ্যাপক।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, কলিমুল্লাহ একটি নির্বাচন কমিশনের দ্বায়িত্ব ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বানানোর অন্যতম কারিগর এ কুশীলব বুদ্ধিজীবী। উনি দিনের ভোট রাতে করানোর বৈধতা দিয়েছেন। আজকের এ আসামি শেখ হাসিনার একজন সুবিধাভোগী। এ রকম কলঙ্কজনক শিক্ষকের জন্য আমার নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলি করা ও তাদের লাশ গুম করার কার্যক্রমেও জড়িত এই কলিমুল্লাহ। গত ১৯ জুলাই রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় এলাকায় এ মামলার ভিকটিম গুলিবিদ্ধ হন। মামলায় তার সংশ্লিষ্টতা থাকায় তদন্ত কর্মকর্তা তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন জানিয়েছেন। আমি এই আবেদনে সমর্থন জানাচ্ছি।
এর বিরোধিতা করে আসামি পক্ষের আইনজীবী আব্দুর রশীদ বলেন, উনি একজন অধ্যাপক। তার নিজস্ব চিন্তা চেতনা আছে। তার কাজ শিক্ষকতা করা। তার কাজ গুলি চালানো নয়। যেসব মামলায় কারাগারে ছিলেন সেগুলোতেও জামিনে পেয়েছেন। হঠাৎ এতদিন পর কেন তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হলো তা বোধগম্য নয়।
আব্দুর রশীদ আরও বলেন, হাইকোর্ট থেকে জামিনের ৩০ ঘণ্টা পর আবারও তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন আসছে। কবেকার সেই নির্বাচনকালীন দ্বায়িত্বের কথা এতদিন পর টেনে আনা যুক্তিহীন। নিয়ম অনুযায়ী ঘটনার এক বছর পরে শোন অ্যারেস্ট দেখাতে পারে না আদালত। এটা দুই বছর আগের মামলা। তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি।
এসময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কলিমউল্লাহ আদালতে কাছে কথা বলার অনুমতি চান। পরে আদালত তাকে এক মিনিটের জন্য কথা বলার অনুমতি দেন।
কলিমউল্লাহ আরও বলেন, ‘নির্বাচনে আমি যা দেখেছি তাই বলেছি। এখানে আমার কোনো দোষ নেই। সকাল ৮ থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আমার দ্বায়িত্ব ছিল। এর আগে পরে কিছু হয়েছে কিনা সেটা তো আমার জানার কথা না। এরপর বিচারক বলেন, ‘এটা তো আপনার দ্বায়িত্ব। আগে পরের ঘটনা আপনার জানার কথা।’
কলিমউল্লাহ আরও বলেন, ‘আমিই আবু সাঈদের হত্যার প্রথম প্রতিবাদ করেছি। আমিই প্রতিবাদ জানিয়েছি সবার আগে। এটার রেকর্ড আছে। জুলাই আন্দোলনে আমি কোথাও বিপক্ষে কাজ করিনি। আমি আন্দোলনকে সমর্থন করেছি।’
তখন বিচারক বলেন, ‘আপনার নির্বাচনী আর্টিকেল আমিও পড়েছি। তদন্তের স্বার্থে আপনাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো।’
-পতাকানিউজ/এএ

