বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায় এবং বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত একটি নতুন বাংলাদেশ গড়াই তাঁদের রাজনৈতিক লক্ষ্য। তিনি দাবি করেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে একযোগে সম্প্রচারিত জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ভাষণে তিনি রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার, রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তুলে ধরেন।
জুলাই আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ভাষণের শুরুতে ডা. শফিকুর রহমান জুলাই আন্দোলনের নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। তিনি বলেন, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। তাঁর ভাষায়, দেশের মানুষ আর সংঘাত চায় না; এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে হবে যেখানে জনগণকে অধিকার আদায়ের জন্য বারবার রাস্তায় নামতে না হয়।
গত দেড় দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, এই সময়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে এবং মানুষের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। তিনি অতীতের জাতীয় নির্বাচনগুলো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
পরিবর্তনের আহ্বান ও তরুণদের ভূমিকা
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নতুন প্রজন্ম একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে পরিবারতন্ত্র বা গোষ্ঠীভিত্তিক ক্ষমতা নয়, বরং জনগণের প্রতিনিধিত্বই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি। তিনি তরুণদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাঁদের সাহস, মেধা ও প্রযুক্তি-জ্ঞানকে দেশের অগ্রগতির চালিকাশক্তি বলে আখ্যা দেন।
রাষ্ট্র সংস্কার ও গণভোট
ভাষণে তিনি জানান, রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত সংস্কার সময়ের দাবি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজনের বিষয়টি তিনি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে জনগণকে এতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, অতীতে শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে। এই সংস্কৃতি পরিবর্তন করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি দাবি করেন, অতীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হননি।
তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন জনগণের জন্য একটি সুযোগ, যার মাধ্যমে সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হতে পারে।
নির্বাচনী দর্শন: ‘পাঁচটিতে হ্যাঁ, পাঁচটিতে না’
দলের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান—এই পাঁচটি বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ এবং দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘না’ বলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নারী, মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা
নারীর মর্যাদা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, নারীরা সমাজের মূলধারায় নেতৃত্বের ভূমিকা রাখবেন। একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন তিনি। “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”—এই নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শিক্ষা, বিচার ও অর্থনীতি সংস্কার
ভাষণে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে তিনটি খাতকে অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি—শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা ও অর্থনীতি। তাঁর মতে, নৈতিকতা ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিচার বিভাগে সংস্কার এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত এবং বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতি তৈরি করে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রোহিঙ্গা ইস্যু
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমমর্যাদার ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলেন জামায়াত আমীর। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
প্রবাসীদের জন্য উদ্যোগ
প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের সমস্যা সমাধানে বিশেষ প্রতিনিধি নির্বাচন এবং সংসদে প্রবাসী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নির্বাচন ও ভোটের আহ্বান
ভাষণের শেষাংশে ডা. শফিকুর রহমান সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানান এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের বৈধ অধিকারকে সম্মান করার কথা বলেন। তিনি ভোটারদের উদ্দেশে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও জোটের প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
-পতাকানিউজ

