জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নের তীর্থভূমি। এই তীর্থভূমিতে অভিজ্ঞদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যবসায়ীদের জায়গা। চলতি সংসদে ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদদের মধ্যে জয় পেয়েছেন ৫৯ শতাংশ। এছাড়া উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে জয় পেয়েছেন ৮৩ শতাংশ। তবে অপেক্ষাকৃত তরুণদের একটি অংশ এবার জয় পেয়ে সংসদে যাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট গ্রহণ হয়েছে। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত হয়েছে। এছাড়া দুটি আসনে বিএনপির জয়ী প্রার্থীর ফল প্রকাশে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
২৯৭ জন বিজয়ীর হলফনামায় দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিজয়ীদের মধ্যে ১৭৪ জন নিজেদের পেশা ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ একাধিক পেশার কথা উল্লেখ করলেও হিসাবের সুবিধার জন্য প্রথমে উল্লেখিত পেশাকেই মূল হিসেবে ধরা হয়েছে।
বিএনপি একাই ২০৯টি আসন জয়ী হয়েছে। তার মধ্যে ১৪৫ জন ব্যবসায়ী, যা দলের মোট জয়ী প্রার্থীর ৬৯ শতাংশ। বিরোধী দলের ভূমিকায় যাওয়া জামায়াতের ৬৮ জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ২০ জন ব্যবসায়ী (২৯ শতাংশ), এনসিপির ছয়জন সংসদ সদস্যের মধ্যে দুজন ব্যবসায়ী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সাত জনের মধ্যে পাঁচজন ব্যবসায়ী। অবশ্য তারা সবাই বিএনপির নেতা ছিলেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীর মধ্যে ১৮ শতাংশ ব্যবসায়ী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে হার বাড়তে থাকায় ১৯৯১ সালে দাঁড়ায় ৩৮ শতাংশে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ ব্যবসায়ী ছিলেন।
ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ প্রার্থীদের জয় বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো। সেই প্রতিবেদনে দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের মন্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রভাব বাড়লে রাজনীতি ও ব্যবসা একাকার হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী মহলের প্রভাবে আইনি ও নীতিকাঠামো দখল হয়; সরকারি ক্রয়-খাত রাজনৈতিক যোগসাজশে দখল হয়। তিনি আরও বলেন, এতে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে লুটপাট, কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি হয়। তিনি সতর্ক করেন, ব্যবসায়ীদের প্রভাব বাড়লে রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষ অবস্থান প্রভাবশালী কোটারির দখলে চলে যায় এবং চোরতন্ত্রের বিকাশ ঘটে।
আইনজীবী, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশা
২৯৭ জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩৬ জন আইনজীবী (বিএনপি ২৪, জামায়াত ৮, এনসিপি ২, অন্যরা ২), শিক্ষক হিসেবে ২৮ জন (বিএনপি ৪, জামায়াত ২৩, এনসিপি ১), রাজনীতি পেশা হিসেবে ১০ জন (বিএনপি ৭, জামায়াত ৩), চিকিৎসক ১২ জন (বিএনপি ৯, জামায়াত ৩), কৃষি ১৭ জন (বিএনপি ১০, জামায়াত ৫, স্বতন্ত্র ২)।
শিক্ষাগত যোগ্যতা
২৯৭ বিজয়ীর মধ্যে ২৪৭ জন উচ্চশিক্ষিত। তারা স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বিএনপি ১৭১, জামায়াত ৬১, বিএনপি-জোট অন্যান্য ৩, জামায়াত জোট ৭, স্বতন্ত্র ৫। শিক্ষাগত দিক থেকে সবচেয়ে কম যোগ্যতা ৯ জনের। ১৫ জন এসএসসি পাস, ১৭ জন এইচএসসি পাস। ১ জন স্বশিক্ষিত ও সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন।
বয়সের বিশ্লেষণ
২৯৭ জয়ীর মধ্যে ৭৩ শতাংশের বয়স ৫০ বছরের বেশি। ৬০ বছরের বেশি ১৪৫ জন। বিএনপির মধ্যে ২০৯ জয়ীর মধ্যে ২১ জনের বয়স ৫০-এর নিচে। ৭০ বা তার বেশি বয়সী ৪৭ জন। অন্যরা ৫১–৬৯ বছরের মধ্যে।
বিএনপির প্রবীণ সংসদ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মুশফিকুর রহমান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪) ৮৫ বছর, মুহাম্মদ ওসমান ফারুক (কিশোরগঞ্জ-৩) ৮৫, আলতাফ হোসেন চৌধুরী (পটুয়াখালী-১) – ৮২ বছর, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (ভোলা-৩) ৮১ বছর।
চেয়ারম্যান তারেক রহমান ৫৭ বছর; নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। দলের সবচেয়ে কম বয়সী জয়ী প্রার্থী: মোহাম্মদ শামীম কায়সার (গাইবান্ধা-৪), ৩৫ বছর।
জামায়াতের মধ্যে ১৯ জন ৫০-এর নিচে। ৭ জন ৭০ বা তার বেশি। প্রবীণতম সংসদ সদস্য: এ টি এম আজহারুল ইসলাম (রংপুর-২) ৭৩ বছর; আব্দুল ওয়ারেছ (গাইবান্ধা-৫) ৭৩। কম বয়সী কুষ্টিয়া-৩ এর আমির হামজা, ৩৩ বছর।
এনসিপির ছয়জন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের মধ্যে ৫ জনের বয়স ৩০-এর নিচে। সবচেয়ে কম বয়সী আবদুল হান্নান মাসউদ, ২৫; আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, ২৭। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩০ বছরের নিচে কেউ নেই। এনসিপির বাইরে ৩০ বছরের কম বয়সী একমাত্র জয়ী: সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা (মাদারীপুর-১, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস)।
-পতাকানিউজ

