মৌলভীবাজার জেলায় প্রায় ২২ লাখ মানুষের বাস। পাশাপাশি রয়েছে লাখো পর্যটকের চাপ। এমন বাস্তবতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকার সড়কপথে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা যানজটে আটকা থাকতে হয় যাত্রী ও চালকদের। এছাড়া সিলেটের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামে চাহিদার তুলনায় কম ট্রেন ও স্বল্প আসনের কারণে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সিলেটবাসী ও আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকরা।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায় দীর্ঘ যানজট, রেলের তীব্র টিকিট সংকট ও শমশেরনগর বিমানবনরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় চলতি মৌসুমে পর্যটক কম এসেছে বিগত সময়ের তুলনায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগের মাধ্যম রয়েছে তিনটি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সড়ক ও রেলপথ। গত এক বছর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ৬ লেনে উন্নীতকরণে ধীরগতির কাজে বেশিরভাগ সময় তীব্র যানজট লেগে থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায়। ঢাকা থেকে মৌলভীবাজারে ৫ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লাগে ১২-১৫ ঘণ্টা। এছাড়া তীব্র যানজটে পড়ে বিদেশ যাত্রীরা বিমানের ফ্লাইট ধরতে না পারার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় মুমূর্ষু রোগী দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থেকে পথেই মারা গেছেন।
সড়ক পথে যখন তীব্র যানজট—এমন অবস্থায় ট্রেনের টিকিটও যেন অমাবস্যার চাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিলেট-আখাউড়া রেলপথ ব্রিটিশ আমলের তৈরি। এ পথের মৌলভীবাজার জেলায় অতি গুরুত্বপূর্ণ চারটি স্টেশন হলো- শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, ভানুগাছ ও শমশেরনগর।
স্টেশনগুলো পর্যটকের যাতায়াতের অন্যতম স্থান। জেলায় বছরে লাখো পর্যটক আসা-যাওয়া করেন এ পথে। তবে রেলস্টেশনগুলোয় যাত্রীর তুলনায় ট্রেনের টিকিট খুবই কম। ফলে সাধারণ যাত্রীরা চাহিদানুযায়ী ট্রেনের টিকেট পান না।
অভিযোগ রয়েছে, সব টিকিট অনলাইনে আসার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গায়েব হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে চলছে এ সংকট। ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পর্যটক ও স্থানীয়দের।
এ জেলায় শমশেরনগর বিমানবন্দর থাকলেও বন্ধ রয়েছে অভ্যন্তরিণ ফ্লাইট। ১৯৯৬ সালে বেসরকারি ফ্লাইট অ্যারো বেঙ্গল যাত্রী সেবা চালু করলেও চাহিদামত সেবা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বন্ধ হয়ে যায়। এখানে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু হলে সিলেটের একাংশ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ কয়েকটি জেলার মানুষ সহজেই যাতায়াত করতে পারবে। বিশেষ করে এসব এলাকার প্রবাসী ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভোগান্তি কমে আসত।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক তপু আহমেদ বলেন, ‘আমরা সাতজন ট্রেনে মৌলভীবাজার যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু টিকিট পায়নি। পরে মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে এসেছি। যানজটের কারণে ১০ ঘণ্টায় মৌলভীবাজার এসেছি। ১০ হাজার টাকার ভাড়ার বদলে চালক ১৫ হাজার টাকা নিয়েছেন।’
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কমলগঞ্জের সাবিনা আক্তার জানান, তিনি গত মাসে জটিল অপারেশন করিয়েছেন। এই মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় গিয়ে আরও একটি অপারেশন করানোর কথা। সেই অবস্থায় সড়ক পথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। যানজটে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর হাসপাতালে গিয়ে তাকে আইসিইউতে ভর্তি হতে হয়েছে।
রাজনগর উপজেলার শওকত আহমেদ নামের এক প্রবাসী বলেন, ‘ঢাকা থেকে আমার ফ্লাইট ছিল। আমি কোনোভাবেই ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে পারিনি। সড়ক পথে তীব্র যানজট ছিল। পরে সিলেট থেকে বিমানে ঢাকা গিয়েছি। ৪-৫ হাজার টাকার টিকিট আমাকে ১১ হাজার টাকায় কিনে ঢাকা যেতে হয়েছে। আমার সঙ্গের একজন সড়কপথে যানজটে আটকা পড়ে ফ্লাইট মিস করেছেন।’
জানতে চাইলে কুলাউড়ার রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার রুমান আহমেদ ও শমমেরনগর স্টেশন মাস্টার রজত কুমার রায় বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই টিকিটের চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। যাত্রীর তুলনায় অতি সামান্য টিকিট রয়েছে। লাইন সংস্কার, টিকিট বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন।’
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন বলেন, ‘ট্রেনের টিকিট বৃদ্ধি, শমশেরনগর বিমানবন্দর চালুসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর চিঠি পাঠিয়েছি।’ রেলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করবেন বলেও জানান তিনি।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পার্থ সরকার বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ট্রেনের কোচ বৃদ্ধি করেছি। এছাড়া অতিরিক্ত যাত্রী থাকলেও কোচ বৃদ্ধি করা হয়। টিকিটের চাহিদা বেশি থাকলে আমাদের কাছে আবেদন করলে তা দেখা হবে।’
পতাকানিউজ/এমআরআর/আরবি

