ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে গত রোববার এক নির্দেশনার মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল বহন নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণের দিন। ভোটগ্রহণের আগে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন সমালোচনার মুখে পড়েছে নির্বাচন কমিশন।
ইসি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে কোনো সাধারণ ভোটার ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। তবে ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার, পুলিশ ইনচার্জ এবং ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ ব্যবহারকারী অঙ্গীভূত বা সাধারণ আনসার ও ভিডিপির দুজন সদস্য এই বিধিনিষেধের বাইরে থাকবে।
নির্বাচন কমিশনের এমন সিদ্ধান্তে মূলত রাজনৈতিক ও সাংবাদিকরা ক্ষুব্ধ। কারণ, অতীতে ভোটকেন্দ্রের বুথের ভেতরে মোবাইল ফোন নিয়ে না থাকাও নির্দেশনা ছিল। এবার কেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিষয়টি সাধারণ ভোটারদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বা আপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিকরা। কারণ, ভোটাররা ঘর থেকে বের হয়ে কেন্দ্রে যাবেন এবং ভোট দিয়ে বাড়িতে ফিরবেন। এখন কেন্দ্রে যদি ফোন নিয়ে প্রবেশ করা না যায় — তাহলে মোবাইল ফোন কার হেফাজতে রেখে কেন্দ্রে প্রবেশ করবেন? সেই প্রশ্ন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবার কেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রচুর ভোটার থাকবেন। তাদের সব মোবাইল নিরাপদে জিম্মায় রাখার মতো বন্দোবস্ত ইসির নেই। সেই সঙ্গে মোবাইল ফোন বাসা-বাড়িতে রেখে কেন্দ্রে যাওয়া বা ফিরে আসা পর্যন্ত ভোটার মূলত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবেন — সেটাও বাস্তবতার সঙ্গে যায় না। অতীত ইতিহাস বলছে, ভোটের দিন কেন্দ্রে গণ্ডগোল হতেই পারে; সেই কারণে স্বজনরা নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উদ্বেগের মধ্যে থাকেন। এমন বাস্তবতায় যদি ভোটার বাসা-বাড়িতে ফোন রেখে যান, তাহলে নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়বে। এতে অনেক ভোটার কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
রাজনৈতিক নেতাদের হুঁশিয়ারি
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানও ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তকে ঘিরে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, “ভোটের অধিকার একবার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। প্রয়োজনে এই অধিকার আবারও লড়াই করে রক্ষা করা হবে। নির্বাচনের দিন মানুষ গর্বভরে ভোটার লাইনে দাঁড়াবে, ছবি তুলবে এবং স্বাধীনভাবে ভোটের আনন্দ উপভোগ করবে। এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ কেউ পাবে না।”
তিনি আরও বলেন, “সর্বজনীন গণতন্ত্রের উৎসবের দিনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সার্বিক জনগণও অধিকার রক্ষায় সদা প্রস্তুত।”
নির্বাচন কমিশন ঘেরাও হবে : নাহিদ ইসলাম
ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারও প্রতিক্রিয়া এসেছে। ঢাকা-১১ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “নির্বাচন কমিশন যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করছে, কার পরিকল্পনার আদলে তারা কাজ করছে। আজ সন্ধ্যার মধ্যে যদি এই বিধিনিষেধ পরিবর্তন না করা হয়, আগামীকাল নির্বাচন কমিশন ঘেরাও হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এমন কোনো আইন যদি পাশ করা হয় যা ভোটকারীদের তথ্যাধিকার বা সাংবাদিকদের কাজের সুযোগ কেড়ে নেবে, তা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচন কমিশন যদি পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত নেয়, তার ফল ভয়াবহ হবে।”

এই নিষেধাজ্ঞা ভোট চুরির পথ তৈরি করছে : হাসনাত আবদুল্লাহ
কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহও একইরকম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল নিষিদ্ধ মানে ভোটার, সাংবাদিক ও সিটিজেন জার্নালিস্টরা সবাইকে মোবাইল ঘরে রেখে আসতে হবে। এটি হঠকারী সিদ্ধান্ত, যা ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করবে। মোবাইলের মাধ্যমে অনিয়ম বা ভোট চুরির ছবি ধারণের সুযোগ থাকায় এই নিষেধাজ্ঞা ভোট চুরির পথ তৈরি করছে।”
সাংবাদিকদের ক্ষোভ
নির্বাচনকালীন দায়িত্বে মোবাইল ফোন ব্যবহার সাংবাদিকদের জন্য অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তে সাংবাদিকরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (আরএফইডি)-এর সভাপতি কাজী জেবেল বলেন, “নির্বাচনের দিন সাংবাদিকরা ভোটকেন্দ্রের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করেন মোবাইলের মাধ্যমে। মোবাইল ব্যবহার বন্ধ করলে আমাদের পেশাগত কাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। এছাড়া, কোনো সাংবাদিককে যদি হামলার শিকার হতে হয়, মোবাইল না থাকলে তা অবিলম্বে জানানোও সম্ভব হবে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে সাংবাদিকরা কার্যত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এটি বাতিল না করা হলে সাংবাদিকরা মাঠে কাজ করতে পারবে না এবং জনগণের তথ্যাধিকারও হুমকির মুখে পড়বে।”
পেশাগত ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকরা মোবাইল ছাড়া ভোটকেন্দ্রে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। মোবাইল দিয়ে ছবি-ভিডিও নেওয়া ছাড়াও তাৎক্ষণিক রিপোর্টিং ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। ৪০০ গজের সীমাবদ্ধতা হলে তথ্য সংরক্ষণ, অনিয়ম দেখানো এবং সঠিক রিপোর্টিং সবই প্রভাবিত হবে।
ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) নির্দেশনা জারি করে সকল রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল প্রবেশে সীমাবদ্ধতা কার্যকর করতে হবে। এটি নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও সাংবাদিকদের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
-পতাকানিউজ

