চট্টগ্রামের রাউজানে নির্বাচনী রাজনীতি এখন কেবল ভোটের হিসাব নয়—এটি রূপ নিচ্ছে শক্তি প্রদর্শনের লড়াইয়ে। মিছিলের সামনে পতাকা, পিছনে মোটরসাইকেলের গর্জন, আর মাঝখানে পুলিশের খাতায় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী—এই দৃশ্যই এখন এলাকার নতুন বাস্তবতা।
আটটি হত্যা মামলাসহ মোট ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান আলম, যাকে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে অভিযান চালাচ্ছে বলে দাবি করছে, সেই রায়হানই প্রকাশ্যে গ্যাং নিয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলটির এক সময়ের ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক মাঠে তার উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম উৎকণ্ঠা।
অথচ এই রায়হানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী (চট্টগ্রাম-৮) এরশাদ উল্লাহকে হত্যার চেষ্টা করেছে। ঢাকাইয়া আকবরকে যেদিন গুলি করে হত্যা করা হয়, ওইদিন ঘটনাস্থলে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ। প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে জীবন নিয়ে ফেরা এরশাদ উল্লাহ এখন ভোটের মাঠে।
আর এরশাদ উল্লাহকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ যে সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে। সেই সন্ত্রাসীকে বগলদাবা করে রাখতে দেখা গেছে গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে। বিষয়টি নিয়ে খোদ বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যেই ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে বিএনপি নেতারা প্রকাশ্যে এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারপরও রায়হানকে নিয়ে গিয়াসউদ্দিন চৌধুরীর এমন কাণ্ডে দলীয় ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে বলে দাবি বিএনপি নেতাদের।
মোটরসাইকেলের বহর, স্লোগানে শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম
শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি দুপুর। পূর্ব রাউজানের রশিদের পাড়ায় নির্বাচনী সমাবেশ। মঞ্চ প্রস্তুত, নেতা উপস্থিত—হঠাৎ করেই মোটরসাইকেলের শব্দে কেঁপে ওঠে এলাকা। বহরের সামনে রায়হান। তার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা একসঙ্গে স্লোগান দিতে থাকে—‘রায়হান ভাই, তালে তালে…’।
একই ডিজাইনের সাদা টি-শার্টে শোভিত অনুসারীদের গায়ে লেখা—‘রায়হান এক্সপ্রেস’। পেছনে বিএনপি প্রার্থীর ছবি, নিচে স্পষ্টভাবে উল্লেখ—‘সৌজন্যে মোহাম্মদ রায়হান আলম’। সমাবেশে উপস্থিত অনেকেই এটিকে সরাসরি শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখছেন।
মঞ্চে উঠে রায়হানের সহযোগীরা বক্তব্য দেন—রায়হান থাকলেই নাকি রাউজান শান্ত! এবং তাকে ‘রক্ষা’ করতে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
পলাতক অথচ প্রকাশ্যে!
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই—যে ব্যক্তি পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ অপরাধী এবং একাধিক হত্যাকাণ্ডের আসামি, তিনি কীভাবে প্রকাশ্যে সমাবেশে অংশ নেন? কেন তাকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না?
স্থানীয়দের মতে, নির্বাচনের আগে প্রতিদিনই মোটরসাইকেল শোডাউন করছে রায়হানের দল। বিকেল নামলেই বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ায় বহর। এতে ভোটারদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেকেই এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি নন।

ফেসবুকে ‘শক্তির বার্তা’
সমাবেশ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিজের ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিও পোস্ট করেন রায়হান। ক্যাপশনে সরাসরি ভোটের আহ্বান। এর আগে একাধিক পোস্টে হুঁশিয়ারিমূলক ভাষা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে সতর্ক করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৩ জানুয়ারির এক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন ‘যারা দিনে এক কথা আর রাতে অন্য কাজ করে, তাদের সাবধান হয়ে যাওয়ার সময় এখনো আছে।’ স্থানীয়রা এটিকে পরোক্ষ হুমকি হিসেবে দেখছেন।
রাউজানের জুরুরকুল খলিফা বাড়ির মৃত বদিউল আলমের ছেলে রায়হান এক সময়ের চোলাই মদ কারবারী। পরে কিছুদিন সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছিল। এরপর একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যায়। সেখানে গিয়ে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে পরিচয় হয়। কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে নিজেই সন্ত্রাসী হিসেবে আর্বিভূত হয় রায়হান।
আর এখন নির্বাচনের মাঠে মদ কারবারি রায়হানই হয়ে উঠেছে বিএনপি দলীয় প্রার্থীর হাতিয়ার। অথচ এই রায়হানের বিরুদ্ধে পুলিশের খাতায় আছে একাধিক হত্যা মামলা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় জোড়া খুনসহ তার বিরুদ্ধে ১৩টি নতুন মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি হত্যা মামলা।
রাউজানে যুবদল কর্মী মো. আলমগীর ওরফে আলম, কদলপুর ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব মো. সেলিম, রাউজান ইউনিয়নের যুবদল কর্মী মোহাম্মদ ইব্রাহিম, নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রাইভেটকারে থাকা মো. বখতিয়ার হোসেন ওরফে মানিক এবং আব্দুল্লাহ আল রিফাতকে গুলি করে হত্যায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
বায়েজিদ থানা এলাকায় শিবির ক্যাডার বড় সাজ্জাদের ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হত্যা করা হয় ঢাকাইয়া আকবরকে। সেই আকবর হত্যা মামলায় আছে রায়হানের নাম। ওই ঘটনায় বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর মুখে পড়েছিলেন। ধানের শীষের প্রার্র্থীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ যে রায়হানের বিরুদ্ধে, সেই রায়হানকে নিয়েই রাউজানে ধানের শীষের প্রচারে নেমেছেন গিয়াস কাদের চৌধুরী। এলাকাবাসী এই কাণ্ডকে বিষ্ময়কর বলছেন।

গত বছরের ২৫ অক্টোবর রাউজান পৌরসভার চারাবটতল এলাকায় যুবদল কর্মী মো. আলমগীরকে গুলি করে হত্যার ঘটনাতেও রায়হানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
নিহতের ছেলে মো. আশফায়েত হাসেন বলেন, ‘তার বাবাকে হত্যায় সরাসরি রায়হান গুলি করেছে।’ নিহতের স্ত্রী লাভলী আকতার বলেন, ‘চোখের সামনে স্বামীকে গুলি করে হত্যা করেছে রায়হান ও তার সহযোগীরা।’
হুমকির ইতিহাস
শুধু নির্বাচনী মাঠ নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে রায়হানের বিরুদ্ধে। গত বছরের নভেম্বর মাসে একাধিক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে ‘ভয়ংকর মৃত্যু’ ও ‘খেলা শুরু’ ধরনের বার্তা দেন তিনি। এক পাথর ব্যবসায়ীকে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, রায়হান চট্টগ্রাম মহানগরের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। হত্যাচেষ্টার মামলায় কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকেই অপরাধ জগতে দ্রুত উত্থান ঘটে।
রাজনৈতিক রঙ বদল
স্থানীয়দের দাবি, অতীতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন রায়হান। স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দ্রুত অবস্থান বদলে বিএনপির কর্মসূচিতে যুক্ত হন। এরপর থেকেই তার প্রভাব আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে বিএনপি প্রার্থী গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত রায়হানের পক্ষ থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সন্ত্রাসী রায়হান কেন ধানের শীষের প্রচারণায়-এমন বক্তব্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর কাছ থেকে পাওয়া না গেলেও বাস্তবে রাউজানের নির্বাচনী এলাকায় এখন হয়ে উঠছে ক্ষমতার প্রদর্শন আর সন্ত্রাসের ছায়ায় মোড়া এক উত্তপ্ত জনপদ। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—আইনের চোখে পলাতক একজন কীভাবে প্রকাশ্যে রাজনীতির মঞ্চে ঘোরাফেরা করেন?
নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই রাউজান যেন অদৃশ্য চাপের মধ্যে ঢুকে পড়ছে—যেন বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি।
আরও পড়ুন :
পতাকানিউজ

