দূর থেকেই শোনা যায় মৌমাছির ভু ভু গুঞ্জন। সরিষা ফুলে বসে মৌমাছিরা মধু আহরণ করছে। মুখভর্তি মধু নিয়ে তারা ফিরে যাচ্ছে মৌবাক্সে। সেখানে মধু জমা করে আবার ছুটে যাচ্ছে ফুলের রাজ্যে।
-এভাবেই দিনভর চলতে থাকে মৌমাছিদের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম। শুধু মধু সংগ্রহই নয়, ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর মাধ্যমে মৌমাছিরা সরিষা গাছের পরাগায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
– এ দৃশ্যের দেখা মিলছে বগুড়ার নন্দীগ্রামে। এই উপজেলায় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন চোখ ধাঁধানো হলুদের সমারোহ। দিগন্তজোড়া সরিষা ফুলে ঢেকে গেছে মাঠ-ঘাট, ফসলের জমি ও খোলা প্রান্তর। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে হলুদ চাদর মেলে ধরেছে চারপাশে।
সকালের নরম রোদ আর শীতল হাওয়ার মাঝে এই সরিষা ফুলের সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে পথচারী ও দর্শনার্থীদের। এই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝেই চলছে আরেক ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ মধু সংগ্রহ। প্রতি বছরের মতো এবারও সরিষা মৌসুমে নন্দীগ্রামে ছুটে এসেছেন বিভিন্ন জেলার মৌ-খামারিরা। উপজেলার বিভিন্ন মাঠে সরিষাখেতের পাশের ফাঁকা জমিতে সারি সারি করে সাজানো হয়েছে শত শত মৌমাছির বাক্স।
মৌ-খামারিরা জানান, একটি মৌবাক্সে সাধারণত ৮ থেকে ১০টি মোম দিয়ে তৈরি চাকের ফ্রেম রাখা হয়। বাক্সের ভেতরে রাখা হয় একটি রানি মৌমাছি। রানি মৌমাছির উপস্থিতির কারণেই শ্রমিক মৌমাছিরা ওই বাক্সে অবস্থান করে এবং ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে চাকের ভেতরে জমা করে।
বাক্সের নিচের দিকে রাখা ছোট ছিদ্র দিয়ে মৌমাছিরা নিয়মিত আসা-যাওয়া করে। একটি মৌবাক্সের চাক সম্পূর্ণভাবে মধুতে ভরতে সময় লাগে প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন। এরপর বিশেষ মেশিনের সাহায্যে চাকের ফ্রেম থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মধুর স্বাভাবিক গুণাগুণ অক্ষুণ্ন থাকে।
নড়াইল জেলার সদর উপজেলার চিলগাছা রঘুনাথপুর গ্রাম থেকে এসেছেন মৌ-খামারি চাঁন মিয়া মোল্লা। তিনি বলেন, ‘আমরা ২৫ ডিসেম্বর নন্দীগ্রামে সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহের জন্য এসেছি। এখানকার পরিবেশ ও ফুলের ঘনত্ব মধু সংগ্রহের জন্য খুবই উপযোগী। আশা করছি এবার ভালো পরিমাণ মধু পাব।’
তিনি আরও জানান, গত ৭ বছর ধরে তিনি মধু সংগ্রহ ও বিক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে নন্দীগ্রামে তার প্রায় ২০০টি মৌবাক্স রয়েছে। প্রতি ১০ থেকে ১৪ দিন পরপর মধু সংগ্রহ করা হয়। একেকবারে ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। বাজারে প্রতি মণ মধু ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একটি মৌসুমে প্রায় ৪ টন মধু সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এতে মোট খরচ পড়ে ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে বছরে ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে নন্দীগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গাজিউল হক জানান, যেসব সরিষাখেতে মৌমাছির মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করা হচ্ছে সেসব জমিতে অন্যান্য জমির তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি ফলন পাওয়া যাবে। কারণ মৌমাছি সরিষা ফুলের পরাগায়নে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
তিনি আরও বলেন, মৌচাষের কারণে একদিকে যেমন সরিষার উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে এলাকাবাসীও অল্প মূল্যে খাঁটি ও ভেজালমুক্ত মধু পাচ্ছেন। এতে কৃষক, মৌ-খামারি এবং সাধারণ ভোক্তা সবাই লাভবান হচ্ছেন। সরিষা ফুলের হলুদ সৌন্দর্য, মৌমাছির কর্মব্যস্ততা আর খাঁটি মধুর সুবাস সব মিলিয়ে নন্দীগ্রামের মাঠ এখন শুধু ফসলের নয়, সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
-পতাকানিউজ/পিএম/এসএমআর

