বেশ কিছুদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ঘুমোট ছিল। যুদ্ধের মেঘে ঢাকা ছিল ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের আকাশ। সেই মেঘ আজ শনিবার বোমা বর্ষণ হিসেবে নেমেছে ইরানে। সঙ্গে সঙ্গে ইরান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আগুন।
এই উত্তেজনার মধ্যে ইরানের অর্ধশতাধিক স্কুল শিক্ষার্থীর প্রাণ গেছে। বোমা পড়েছে ইস্রায়েলেও। এছাড়া সৌদি আরব, দুবাই, বাহরাইনসহ একাধিক আরব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। হামলার কারণে বিমান রুটও বন্ধ হয়ে গেছে।
সবমিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা শুরু করে। এ হামলার জবাবে ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে বাধ্য হয়েছে। তেহরানসহ একাধিক শহরে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে, আর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু সামরিক সংঘাত নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ব্যালিস্টিক ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বিরাজ করছে। শনিবারের এই হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
ইরানে আকস্মিক হামলার নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। দেশটি বলেছে, একতরফাভাবে হামলা চালানো হয়েছে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং সামরিক অবকাঠামো দুর্বল করা। বিশেষত ইরানের নৌ সক্ষমতা, যা পারমাণবিক ও সামরিক ধ্বংস ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, তা ছিল মূল লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার সঙ্গে সঙ্গে ইরান প্রতিহতের ঘোষণা দেয়। রেড লাইন চূড়ান্ত—বলেই তারা পাল্টা জবাব দিয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে তেহরান, কেরমানশাহ, কোম, তাবরিজ, ইসফাহান ও ইলামসহ বিভিন্ন শহর সতর্কতায় আছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সদর দপ্তরের কাছাকাছিও হামলার খবর পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরানে আকস্মিক হামলার পর বিশ্বনেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘ, ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের দ্রুত নিষ্পত্তি চেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ইতিমধ্যেই সতর্কতা বাড়িয়েছে, বিমান চলাচল সীমিত করা হচ্ছে, এবং কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক উত্তেজনা যদি রাজনৈতিক আলোচনার দিকে ধাবিত না হয়, তবে এটি বড় ধরনের ক্রস-বর্ডার সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা এবং মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই হামলা শুধুমাত্র প্রতিশোধ নয়, বরং ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিগ্রস্ত করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। ইসরায়েলের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক প্রোগ্রাম নিয়ন্ত্রণে রাখা, যাতে সরাসরি হুমকি কমানো যায়।
সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
মধ্যপ্রাচ্যের তেলের সরবরাহে বিঘ্ন, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি
শরণার্থী সংকট তৈরি হওয়া
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, সংঘাত যদি অন্য অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনেই ইসরায়েল একতরফাভাবে হামলা শুরু করে। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রও জড়িত। তাঁর যুদ্ধনীতি পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। ফলে অঞ্চলে উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
ইরান জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্য ও স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রধানভাবে আক্রান্ত হয়েছে।
বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তর ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে পড়েছে বলে দেশটি জানিয়েছে, যা তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে। কাতারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বিমানসেনা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্যাট্রিয়ট দ্বারা প্রতিহত করা হয়েছে। কুয়েত এবং দুবাইতেও হামলা হয়েছে; দুবাইয়ে একজন নিহত হয়েছেন।
আক্রমণের পর কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে এবং সতর্কতা জারি করেছে। পশ্চিম ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের এই হামলা সংঘাতকে শুধুমাত্র দেশীয় বিরোধ থেকে বেরিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সঙ্কটে পরিণত করেছে।
ইরানি বাহিনী জানিয়েছে, তারা তাদের নির্দেশনায় থাকা প্রতিকূল শক্তির কাছে ‘যেকোনো লক্ষ্য বৈধ লক্ষ্য’ হিসেবে দেখছে এবং যুদ্ধ অব্যাহত রাখবে।
সূত্র : আল জাজিরা
-পতাকানিউজ

