ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা চলছে। এই অস্থিরতার আঁচ বাংলাদেশের অন্য জেলার মতো পড়েছে ফেনীতেও। জেলার বহু পরিবার সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নির্ভর। এসব দেশে অর্ধকোটির বেশি বাংলাদেশি কর্মী অবস্থান করছে
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাইরেন, কঠোর নিরাপত্তা ও চলাচলে সতর্কতার কারণে প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে জেলার প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা এখন প্রিয়জনদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বিভিন্ন প্রবাসীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলমান পরিস্থিতিতে তাদের ছেলে-মেয়ে ও আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে। তারা আশঙ্কা করছেন, যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই প্রিয়জনদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার জন্য বার বার মোবাইল ফোনে নির্দেশনা দিচ্ছেন।
জেলার গ্রামাঞ্চলে এখন টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে স্বজনদের খবর নেওয়ার দৃশ্য নিত্যদিনের। সুযোগ পেলেই প্রবাসীরা পরিবারকে আশ্বস্ত করছেন। আর প্রবাসী পরিবারগুলোর একটাই প্রার্থনা-প্রিয়জনরা যেন নিরাপদে দেশে ফিরতে পারেন অথবা কর্মস্থলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।
সৌদি প্রবাসী আরাফাত হোসেন রিয়াদ হোসেন মোল্লা জানান, খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে আমাদের ভয় ও আতঙ্ক বাড়ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাসায় থাকতে পরিবার থেকেও বলা হচ্ছে। সব মিলিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় আছি।
সৌদি আরবের দাম্মামে অবস্থিত একটি গ্যাস প্ল্যান্টে কর্মরত ফুলগাজী উপজেলার আমজাদ হাট ইউনিয়নের প্রবাসী শরিফুল ইসলাম সাগর জানান, সকাল থেকে ইরানের ড্রোন হামলার খবর পাচ্ছি। আমরা আতঙ্কে আছি। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দেশ থেকে বাবা-মা বারবার ফোন দিয়ে খবর নিচ্ছেন।
একই ইউনিয়নের প্রবাসী মো. হাসান মির্জা বলেন, ২ মার্চ বাংলাদেশে যাওয়ার ফ্লাইট ছিল, কিন্তু যেতে পারিনি। ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে। দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলার কারণে সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। আমাকে নিয়ে পরিবার দুশ্চিন্তায় আছে।
দুবাইয়ের সারজায় অবস্থানরত রিয়াদ হোসেন শুভ জানান, তারা ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের কয়েকজন একসঙ্গে থাকছেন। কোম্পানি থেকে নিরাপদে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন তারা নিরাপদে আছেন।
পরশুরাম পৌরসভার বাসিন্দ আবু আহাম্মদ বলেন, তার দুই ছেলে সৌদি আরবে থাকেন। চলমান পরিস্থিতিতে তিনি নিয়মিত মোবাইলে তাদের খবর নিচ্ছেন এবং সন্তানের নিরাপত্তার জন্য দোয়া করছেন।
এদিকে ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের মোরশেদ আলম জানান, তার চাচা, মামা ও খালু দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসে আছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা পরিবার নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। প্রতিদিন ফোন করে তাদের নিরাপদ স্থানে থাকার কথা বলছি। তিনি বলেন, টেলিভিশনে খবর দেখলেই ভয় লাগে।
দাগনভূঞা উপজেলার পূর্ব চন্দ্রপুর ইউনিয়নের মোবারক হোসেন বলেন, তার তিন ছেলে দুবাই ও সৌদি আরবে থাকেন। ওদের নিয়ে সব সময় চিন্তায় থাকি। পরিস্থিতি খারাপ হলে যেন দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরে যায়-এ কথাই বলছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন সবাই ভালো থাকে।
ফেনী শহরের একাডেমি এলাকার বাসিন্দা আরজিনা আক্তার রুবি জানান, তার স্বামী কাতারে কর্মরত। প্রতিদিন কয়েকবার কথা বলি। বাইরে কম বের হতে বলেছি। সন্তানরা বাবার জন্য খুব চিন্তা করছে। আমরা শুধু চাই, সে যেন নিরাপদে থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ফেনীর প্রবাসী নির্ভর অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সরকার ও দূতাবাসগুলোর তৎপরতা এবং প্রবাসীদের সতর্ক অবস্থান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফেনী জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিসের সহকারি পরিচালক দিদার মিয়া জানান, ২০০৫ সাল হতে জানুয়ারি-২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখের অধিক বিদেশগামী কর্মী অনলাইন রেজিষ্ট্রেশন ও ফিঙ্গার ইম্প্রেশন গ্রহণ করেছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ১৫৭৩ জন, ২০২৫ সালে ১৫,৩৭১ জন, ২০২৪ সালে ১৫,৪০০ জন, ২০২৩ সালে ২২,৮১৫ জন রয়েছে।
-পতাকানিউজ/এএএম

