আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর বিএনপি পুড়ছে আগুনে। এই আগুনের লেলিহান শিখায় বিএনপি যেমন অঙ্গার হচ্ছে, তেমনি নেতা-কর্মীদের ক্ষোভের প্রকাশও ঘটছে। বড় দল হিসেবে বিএনপিতে মনোনয়ন বঞ্চিতদের ‘অগ্নি প্রতিবাদ’ আপাতত দৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলেও দলটি ভবিষ্যতে এই ‘অগ্নিপ্রতিবাদ’ সামাল দিতে পারবে কি না- তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
দলটি গত ৩ নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩৭টি আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয়েছে ব্যাপক অস্থিরতা। মনোনয়ন বঞ্চনা, প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি এবং দলীয় সিদ্ধান্তে অসন্তোষ—সব মিলিয়ে বিভিন্ন জেলায় দফায় দফায় সংঘর্ষ, বিক্ষোভ ও অবরোধের ঘটনা ঘটছে। দেশের অন্তত ১২টি জেলায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে ফরিদপুর-১ আসনে এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি। তবে মনোনয়ন প্রত্যাশী দুই পক্ষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই সহিংস হচ্ছে। গত শুক্রবার বিকেলে বোয়ালমারীতে দলটির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশের তিন সদস্যসহ অন্তত ২৩ জন আহত হন।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি খন্দকার নাসিরুল ইসলাম ও উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শামসুদ্দীন মিয়ার নেতৃত্বে সংগঠনটি দুই ভাগে বিভক্ত। উভয় পক্ষই আসন্ন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশী। সংঘর্ষের সময় বিএনপির এক পক্ষের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়, পুড়িয়ে দেয়া হয় অন্তত ১০টি মোটরসাইকেল। আশপাশের দোকানপাটও রেহাই পায়নি।
একইভাবে সিলেট ও রাজশাহীতেও বিক্ষোভ করেছে দলটির নেতা কর্মীরা। সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী ঘোষণার দাবিতে বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে তিন উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে স্থানীয় বিএনপির একাংশ। আবার প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিও ওঠে রাজশাহী-৩ আসনে। পবা উপজেলায় ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’-এর অনুষ্ঠানে নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় প্রার্থী শফিকুল হক মিলনের পরিবর্তনের দাবি জানান।

আবার দিনাজপুরে নেতা-কর্মীরা মাঠে নেমেছেন কাফনের কাপড় পড়ে। দিনাজপুর-২ আসনে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে শুক্রবার সকালে কাফনের কাপড় পরে মৌন মিছিল করেছেন তিন মনোনয়নবঞ্চিত নেতার অনুসারীরা। তারা অভিযোগ করেন, ঘোষিত প্রার্থী সাদিক রিয়াজ চৌধুরী স্থানীয় আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠজন।
একইভাবে মাদারীপুরে স্থগিত মনোনয়ন ঘিরে উত্তেজনা চলছে। মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী কামাল জামান মোল্লার মনোনয়ন স্থগিতের প্রতিবাদে শুক্রবার বিকেলে হাজারো নেতাকর্মী সমাবেশ করেছেন। কামাল জামানের দাবি, ‘ষড়যন্ত্র করে তার মনোনয়ন স্থগিত করা হয়েছে, তবে দল আবার আমাকে পুনরায় প্রার্থী করবে।
অন্য বিভাগের মতো চট্টগ্রামেও আগুন জ্বলেছে। চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে কেন্দ্রীয় নেতা আসলাম চৌধুরী মনোনয়ন না পাওয়ায় সমর্থকেরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। রেললাইনে আগুন দেয়া হয়। ফলে সাময়িক বন্ধ ছিল ট্রেন চলাচল।
দলটির নেতা-কর্মীদের এমন আচরণে কেন্দ্রীয়ভাবে ‘বহিস্কার’ থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। এরই মধ্যে দলীয় নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমল কদর, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মোরছালিন ও ছাত্রদল নেতা কোরবান আলী সাহেদকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। সবশেষ আরো তিনজনের পদ স্থগিত করা হয়। আবার ফটিকছড়ি আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে জ্বলেছে আগুন।

মনোনয়ন বঞ্চিতদের আগুনে পুড়ছে সাতক্ষীরা জেলাও। সেখানে সাতক্ষীরা ৩ আসনে অধ্যাপক শহিদুল আলম মনোনয়ন না পাওয়ায় তাঁর সমর্থকেরা হরতাল ও সড়ক অবরোধ করেছেন। কুষ্টিয়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা, মেহেরপুরসহ একাধিক জেলায়ও একই চিত্র—বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধ।
কুমিল্লা-৬ আসনে মনোনয়ন বঞ্চিত আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের অনুসারীরা ঢাকাগামী মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। কুষ্টিয়া-৩ আসনে সাবেক সাংসদ সোহরাব উদ্দিনের সমর্থকেরা শহরের মজমপুর রেলগেটে সড়কে আগুন দেন। কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট ও লালমাই উপজেলা) আসনে মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার সমর্থকেরা রেলপথ অবরোধ করেছেন।
সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী পরিবর্তন করে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শহিদুল আলমকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে টানা চারদিন বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন তাঁর অনুসারী নেতা-কর্মীরা। এসব সমাবেশে আশাশুনি উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ছাড়াও বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে সাধারণ মানুষ অংশ নেন। এ সময় আশাশুনি বাজার এলাকায় এ ঘণ্টা ধরে যান চলাচল বন্ধ থাকে।
জেলায় জেলায় বিএনপির ক্ষোভের আগুন দেখে তা প্রশমন করতে বিএনপি কাজ করছে বলে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘বহিস্কারের’ মতো কড়া ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। মনোনয়ন বঞ্চিতদের বিক্ষোভকে অনুপ্রবেশকারীদের উসকানি বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, দলীয় সিদ্ধান্তে যারা মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে বিএনপি মহাসচিব জানিয়েছেন, ঘোষিত প্রার্থীর তালিকায় সংশোধনী আসতে পারে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘যারা মনোনয়ন পাননি, বিশ্বাস রাখুন, দল তাদের যথাযথ দায়িত্ব ও সম্মান দেবে।’
বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মীর হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘৯৯ ভাগ আসনেই প্রার্থীরা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। কারণ সবাই চায় ধানের শীষের বিজয়। এর বাইরে যদি কোথাও অস্থিতিশীলতা হয়, তা অনুপ্রবেশকারীদের কাজ। বিএনপির ভেতরে বিভ্রান্তি সৃষ্টির এ প্রচেষ্টা কোনোভাবেই সফল হবে না।’
পতাকানিউজ/এএস/কেএস

