পৃথিবীর বাইরে মানব বসতি স্থাপন এবং সেখানে বংশবৃদ্ধি—এই ধারণা অনেক যুগের স্বপ্ন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা দেখাচ্ছে, মহাকাশে প্রজনন প্রক্রিয়া মানুষের জন্য সহজ নয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, শূন্য মাধ্যাকর্ষণ বা মাইক্রোগ্রাভিটি মানুষের প্রজনন ক্ষমতায় মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ মিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মানুষ এখন আর কেবল পৃথিবীতে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। ইলন মাস্কের স্পেস-এক্স থেকে নাসা -সবার লক্ষ্য মঙ্গলে মানব বসতি গড়ার। কিন্তু গবেষকরা সতর্ক করেছেন, মহাকাশের পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে মানুষের সন্তান জন্ম দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। মাইক্রোগ্রাভিটি বা অতি-ক্ষুদ্র মাধ্যাকর্ষণ মানুষের শরীরের কোষ স্তরে এমন পরিবর্তন আনে, যা প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
প্রজনন কোষে মাইক্রোগ্রাভিটির প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি না থাকায় শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর কার্যকারিতা হ্রাস পায়। শুক্রাণুর গতিশীলতা কমে যায়, তাদের গঠন পরিবর্তিত হয়, ফলে স্বাভাবিক নিষেক বা ফার্টিলাইজেশন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। একইভাবে, ডিম্বাণুর বিকাশেও অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে। এই কারণে মহাকাশে মানব সন্তান জন্ম দেওয়া প্রাকৃতিকভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ভ্রূণের বিকাশ ও কসমিক রেডিয়েশনের ঝুঁকি
ভ্রূণের বিকাশের ওপরও মহাকাশের পরিবেশ প্রভাব ফেলে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বক ক্ষেত্র আমাদের কসমিক রেডিয়েশন থেকে রক্ষা করে। কিন্তু মহাকাশে এই সুরক্ষা নেই। মহাজাগতিক বিকিরণ ভ্রূণের ডিএনএ-তে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে, যার ফলে জন্মগত ত্রুটি, গর্ভপাত বা অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যাওয়া না গেলে দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ মিশনে মানব প্রজাতির টিকে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
হরমোন, শারীরিক পরিবর্তন ও প্রজনন অঙ্গ
দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকা মানুষের হরমোন নিঃসরণে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে। ইস্ট্রোজেন এবং টেস্টোস্টেরনের মতো প্রজনন হরমোনের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। হাড়ের ক্ষয়, পেশি দুর্বলতা এবং প্রজনন অঙ্গের রক্ত সঞ্চালন হ্রাস পায়। সব মিলিয়ে একজন মহাকাশচারীর প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়।

সমাধানের সম্ভাবনা
গবেষকরা বলছেন, কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান করা কঠিন। নাসার ‘আর্টেমিস’ মিশন চাঁদে, পরবর্তীতে মঙ্গলে মানুষের বসতি গড়ার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু এই নতুন তথ্য দেখাচ্ছে, বর্তমান প্রযুক্তিতে মহাকাশে সুস্থ মানব সন্তান জন্ম দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
মহাকাশ জয় করা আমাদের স্বপ্ন, তবে জীববিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মাইক্রোগ্রাভিটি মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষকে প্রভাবিত করে। সুতরাং, ভিনগ্রহে পাড়ি জমানোর আগে নিশ্চিত করতে হবে যে সেখানে মানব প্রজাতির টিকে থাকার মতো নিরাপদ এবং অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। বিজ্ঞানীদের এই সতর্কবার্তা মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনাকে আরও বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ করতে সাহায্য করবে।
সূত্র : বৈজ্ঞানিক গবেষণা
-পতাকানিউজ

