খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের ঢাকাইয়া শিবির, লালটিলা ও নবীনগর এলাকায় ঘরদুয়ারের পাশে কয়লা উৎপাদন চলছে। স্থানীয়দের বাগানে থাকা বা কেনা গাছগাছালি পুড়িয়ে কয়লা বানানো এখন এসব এলাকার প্রধান জীবিকা। প্রায় ৮০-৮৫ পরিবারের প্রতিটিতে গড়ে ২-৩টি করে চুলা থাকায় পুরো এলাকায় দুই শতাধিক কয়লার চুলা সক্রিয়। এর মধ্যে প্রায় একশ চুলায় প্রতিনিয়ত আগুন জ্বলছে। এই জ্বলন্ত চুলায় বনের গাছ পোড়ানো হয়, যা স্থানীয় পরিবেশ এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি চুলায় মাসে প্রায় ২০০ মণ গাছ পুড়িয়ে ৯০০ থেকে ১০০০ কেজি কয়লা উৎপাদিত হয়। এসব কয়লা স্থানীয় পাইকাররা প্রতি কেজি ৩০-৩২ টাকায় কিনে শহরমুখী বাজারে সরবরাহ করেন। হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ১০০ চুলায় প্রতি মাসে প্রায় ৮০০ মেট্রিক টন গাছ পুড়ে ১০০ মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু এই উৎপাদনের ফলে ঘন ধোঁয়া সরাসরি স্থানীয়দের ঘরে প্রবেশ করছে। এর প্রভাবে শিশু, বৃদ্ধ ও কর্মক্ষম মানুষ শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালাপোড়া এবং নাক দিয়ে পানি পড়াসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছেন।
সরজমিনে দেখা গেছে, ঢাকাইয়া শিবির, লালটিলা ও নবীনগর এলাকায় প্রায় ২০০টি পরিবার বসবাস করেন। তাদের ১৫ শতাংশ ধান চাষ করেন, ৫০-৬০ শতাংশ ফলজ ও বনজ বাগানের ওপর নির্ভরশীল। বাকি ৩-৪ শতাংশ মানুষ চাকরিজীবী। বাকি শ্রমজীবী ও ভূমিনির্ভর মানুষের প্রধান আয় এখন কয়লা উৎপাদন।
একজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘এখানে বেশিরভাগ মানুষ কয়লা উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। দীর্ঘদিন চুলায় কাজ করলে চোখ-মুখ জ্বালা, শ্বাসকষ্ট লেগেই থাকে। কিন্তু উপার্জনের বিকল্প পথ নেই।’
ঢাকাইয়া শিবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে নেকবর আলী ও আবু সাঈদের বাড়ির মাঝেই পাঁচটি কয়লার চুলা। আবু সাঈদ বলেন, ‘আমাদের আয়ের উৎস মূলত বাগান করা আর গাছ জ্বালিয়ে কয়লা তৈরি। নিজের গাছ থাকলে লাভ বেশি হয়। গাছ কিনে করলে মাসে দুইবার আগুনে ৩-৪ হাজার টাকা লাভ থাকে।’
স্থানীয় জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ‘ঢাকাইয়া শিবির এলাকায় বেশিরভাগ পরিবারেই ৩-৪টি করে চুলা আছে। ৯-১০ মাস ধরে কয়লা উৎপাদন হয়। আগে মাথায় করে বাজারে নিতাম, এখন শহরমুখী ট্রাকেই চলে যায়।’
অবৈধভাবে গাছ পোড়ানো এবং ধোঁয়ার প্রভাবে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে- এমনটিই জানালেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. নাঈমুল হক। তিনি বলেন, ‘কয়লার ধোঁয়ায় থাকা সূক্ষ্ম কণা চোখ ও শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে নানা রোগ সৃষ্টি করে। ব্রঙ্কাইটিস, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ে।’
বন বিভাগের গাড়ীটানা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘উপজেলায় সরকারি সংরক্ষিত বন নেই। ব্যক্তিগত প্রয়োজন হলে কয়লা তৈরি কেউ বাধা দেয় না। কিন্তু বাণিজ্যিক উৎপাদন বেআইনি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আফরোজ ভূঁইয়া জানান, ‘এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখন পর্যন্ত কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেননি।’
পতাকানিউজ/এসআর/এএইচ

