ডিজিটাল যুগের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার ধরনও পাল্টে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন প্রতারণা, হুন্ডি ও অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে ৩৪ কোটি টাকার মানিলন্ডারিং চক্র উদঘাটন করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আশ্চর্যের বিষয়—এই চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন একই পরিবারের ৫ সদস্য।
‘ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রলোভন’ থেকে প্রতারণার শুরু
সিআইডির অনুসন্ধান বলছে, চক্রটি মূলত টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের টার্গেট করত। তারা প্রথমে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে সহজে অর্থ উপার্জনের প্রস্তাব দিত। যারা আগ্রহ দেখাতেন, তাদের যোগ করা হতো বিশেষ একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে—যেখানে ভিকটিম ছাড়া বাকি সব আইডি ছিল ভুয়া।
গ্রুপে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ইতিবাচক মন্তব্য ও ‘সফলতা গল্প’ দেখে ভুক্তভোগীরা আস্থা পেতেন। এরপর কিছু সহজ কাজ দিয়ে প্রথমে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হতো। এই ছোট অঙ্কের পেমেন্টেই ভিকটিমদের বিশ্বাস দৃঢ় হতো। তারপরই শুরু হতো বড় প্রজেক্টের প্রলোভন, যেখানে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হতো বিভিন্ন অজুহাতে।
ভুয়া অ্যাকাউন্টে টাকার খেল
চক্রটি শুধু অনলাইন প্রতারণায় সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও নিরক্ষর মানুষদের টার্গেট করে সরকারি ভাতার প্রলোভনে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হতো। এই এনআইডি ব্যবহার করে খোলা হতো ভুয়া ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ ইত্যাদি) অ্যাকাউন্ট।
এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হতো জুয়া, প্রতারণা ও হুন্ডির লেনদেনে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত ব্যক্তি জানতেন না যে তার নামে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। টেলিগ্রাম ও জুয়া প্ল্যাটফর্মে জমা হওয়া অর্থ ধীরে ধীরে এই অ্যাকাউন্টগুলো ঘুরে পৌঁছে যেত চক্রের মূল হোতাদের কাছে।
একই পরিবারের নেতৃত্বে অপরাধের সাম্রাজ্য
মামলার তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির মূল নেতৃত্বে ছিলেন আরিফুল ইসলাম রিফাত নামের এক যুবক। তাকে সহযোগিতা করতেন তার মা লিলি আক্তার, দুই বোন রিমি ও রুমি আক্তার এবং বোনের স্বামী আবদুল কাদির জিলানি।
এই পরিবারের সদস্যরাই পুরো নেটওয়ার্কের মূল আর্থিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করতেন। তারা পরিবারের সদস্যদের নামেই একাধিক ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাকাউন্ট খুলে ছোট ছোট লেনদেনের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করতেন, যাতে সন্দেহ না জাগে।
হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিদেশে টাকা পাচার
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, দেশে অর্জিত অবৈধ অর্থ পরে ডিজিটাল হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হতো। এই অর্থের একটি অংশ আসত অনলাইন জুয়ার লেনদেন থেকে, আরেক অংশ হতো ঘুষ বা দুর্নীতির টাকাও।
অর্থ পাচারের পদ্ধতিটি ছিল জটিল ও বহুস্তরীয়। প্রথমে অর্থ কয়েক দফা স্থানান্তর করা হতো পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের অ্যাকাউন্টে, পরে বিদেশি প্ল্যাটফর্মে ডলার বা ক্রিপ্টো কিনে তা বিদেশে স্থানান্তর করা হতো।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন ধরনের অপরাধ
অর্থনীতিবিদ ও সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অপরাধ নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি নির্ভর প্রতারণার দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি যত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, অপরাধীরা তত দ্রুত নতুন কৌশল শিখছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তৌফিক আহমেদ বলেন, এখন প্রতারণা কেবল ফোন কল বা ইমেইলে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষকে ধীরে ধীরে আস্থা অর্জনের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে, যা মনস্তাত্ত্বিক প্রতারণার উন্নত রূপ।
তদন্তে সিআইডি, অভিযান চলমান
বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। ৯ জন এজাহারনামীয় অভিযুক্তের পাশাপাশি অজ্ঞাত ৭-৮ জন সহযোগীকেও শনাক্তের চেষ্টা চলছে। সিআইডি জানায়, ইতোমধ্যে বেশ কিছু ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে।
এজাহারনামীয় অভিযুক্তরা হলো – আরিফুল ইসলাম রিফাত, মো. ইমরান হোসেন, মো. নুরে আলম, মোছা. লিলি আক্তার, মোছা. রিমি আক্তার, রুমি আক্তার, আব্দুল কাদির জিলানি, মুহা. নেয়ামতুল্লাহ, মোঃ রিয়াদ।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন খান বলেন, চক্রটির আর্থিক লেনদেন, বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের পথ ও সহযোগীদের চিহ্নিত করতে তদন্ত চলছে। আমরা আশা করছি, পুরো নেটওয়ার্ক শিগগিরই উন্মোচিত হবে।
পতাকানিউজ/এআই

