হালাল শুধু একটি ধর্মীয় শব্দ নয়; এটি মুসলিম ভোক্তার জীবনে খাবার, ওষুধ, কসমেটিকস ও সেবা নির্বাচনকে নির্ধারণ করে। ইসলাম ‘হালাল’ ও ‘তয়্যিব’ এই দুই ধারণাকে গুরুত্ব দেয়; কেবল বৈধ নয়, পবিত্র ও নিরাপদও হতে হবে। আল্লাহ বলেন- হে মানবমন্ডলী! পৃথিবীর মধ্যে যা বৈধ ও পবিত্র, তা হতে আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করনা, নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৬৮)।
মালয়েশিয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে হালাল ইন্ডাস্ট্রিকে নীতি-নির্ধারণ ও বাজারিকভাবে সংগঠিত করে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি করেছে; বাংলাদেশ একই সুযোগটি ব্যবহার করতে পারলে তা অর্থনীতির নতুন দিগন্ত হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।
ইসলামে খাদ্য-পানীয় সন্তুষ্টিকর ও বিশুদ্ধ হওয়া জরুরি। হাদীসে উল্লেখ আছে- ‘ইন্নাল্লাহা তাইয়্যিবুন লা ইয়াক্ববুল্লা তাইয়্যিবা’ (আল্লাহ পবিত্র; তিনি কেবল পবিত্রকেই গ্রহণ করেন) -যা নির্দেশ করে যে ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে পণ্যের গুণগত মানও অপরিহার্য (সহীহ মুসলিম)। এই নীতিই আধুনিক ‘হালাল সার্টিফিকেশন’ ধারণার ইসলামী আধ্যাত্মিক ভিত্তি।
মালয়েশিয়া হালাল শিল্পকে সুপরিকল্পিত কৌশলে রাষ্ট্রীয়ভাবে উন্নীত করেছে- হালাল নীতিমালা, সার্টিফিকেশন, গবেষণা, এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং একত্রে চালু করে। তাদের Halal Industry Master Plan (HIMP 2030) একটি লক্ষ্যভিত্তিক রোডম্যাপ যা দেশটিকে ‘গ্লোবাল হালাল লিডার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য রেখেছে। মালয়েশিয়ার এই বাস্তবায়ন কৌশল– সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি শিল্প ও রপ্তানিমুখী নীতির সমন্বয় অন্য দেশের জন্য কার্যকর রেফারেন্স।
অর্থনৈতিক প্রভাবও লক্ষণীয় : বৈশ্বিক মুসলিম ভোক্তা বাজার- বিশেষত হালাল ফুড অত্যন্ত বড়; সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে ২০২৩ সালে হালাল খাদ্য সেক্টরের আয় প্রায় ১.৪৩ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০২৮ সালে তা প্রায় ১.৯৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এ সুযোগকে কাজে লাগালে রপ্তানি ও বিনিয়োগে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব।
বাংলাদেশে হালাল সার্টিফিকেশনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অসম্পূর্ণ; কিছু বেসরকারি সনদ থাকলেও তা স্থায়ী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত না। একই সঙ্গে দেশে খাদ্য ভেজাল ও প্রক্রিয়াকরণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুতর গবেষণা ও ক্ষেত্রসমীক্ষায় দুধ, ভোজ্য তেল ইত্যাদিতে ভেজালের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা হালাল-তৎপরতার গুরুত্ব বাড়ায়।
এই দুটি সমস্যাই (ক) প্রতিষ্ঠানগত অনুপস্থিতি ও (খ) খাদ্য মানের অস্পষ্টতা রপ্তানি-বাজারে প্রবেশ ও ভোক্তা আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় নতুন অধ্যায়
রপ্তানি বৃদ্ধি : বাংলাদেশ কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে সমৃদ্ধ। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হালাল সার্টিফিকেশন পেলে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকান মুসলিম বাজারে প্রবেশ করে রপ্তানি বর্ধিত করা সম্ভব।
কর্মসংস্থান ও টেকসই শিল্প : হালাল ভ্যালু-চেইন (কৃষি → প্রক্রিয়াজাতকরণ → প্যাকেজিং → লজিস্টিকস → ব্র্যান্ডিং) বহু চাকরি তৈরি করতে পারে।
বিনিয়োগ আকর্ষণ : হালাল-কমপ্লায়ান্ট অবকাঠামোতে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে- হাইজিেনিক অ্বজারভেশন, কোল্ড-চেইন, ল্যাবরেটরি সুবিধা ইত্যাদি গড়ে উঠবে।
স্থানীয় ভোক্তা আস্থা ও জনস্বাস্থ্য : মানসম্মত হালাল পণ্য ভোক্তার স্বাস্থ্য রক্ষা করবে এবং ভোক্তা আস্থা বাড়াবে, যা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিরও কল্যাণ করবে। (উপরোক্ত বৈশ্বিক বাজার পরিসংখ্যান ও মালয়েশিয়ার মডেল উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচ্য)।
ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব
ইসলাম কেবল ধর্মীয় অনুমোদন নয়—খাদ্যের পবিত্রতা ও নৈতিক উৎসকেও মূল্য দেয়। কোরআন ও হাদিসে ‘ঐশ্বরিক অনুকরণীয় খাদ্য’ গ্রহণের নির্দেশ স্পষ্ট; যা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নৈতিকতা, সততা ও ভোক্তা অধিকার রক্ষায় সহায়ক। ফলে একটি কার্যকর হালাল নীতি রাষ্ট্রকে ধর্মীয় কর্তব্য ও সামাজিক ন্যায়-নিয়ম উভয়কেই সুনিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
নিম্নভিত্তিতে কিছু সুপারিশ
জাতীয় হালাল অথরিটি গঠন : মালয়েশিয়ার JAKIM/HIMP মডেল অনুকরণ করে একটি স্বতন্ত্র সরকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে হবে যা সার্টিফিকেশন, ল্যাব যাচাই ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন পরিচালনা করবে।
ল্যাব ও পরীক্ষা-প্রণালী উন্নয়ন : আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব গঠন করে ট্রেসিবিলিটি (traceability) ও টেস্টিং নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষা ও দক্ষতা : বিশ্ববিদ্যালয় ও টেকনিক্যাল কোর্সে ‘হালাল ম্যানেজমেন্ট’-এ দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।
আইনি কাঠামো ও প্রচার : হালাল ফুড আইন প্রণয়ন, ভোক্তা সচেতনতা ও মিডিয়া প্রচারণার মাধ্যমে আস্থা তৈরি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সমঝোতা : মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য হালাল-লিডার দেশগুলোর সঙ্গে এগ্রিমেন্ট করে রিকগনিশন (mutual recognition) অর্জন করা প্রয়োজন।
মালয়েশিয়ার হালাল নীতি প্রমাণ করেছে যে ধর্মীয় অনুশাসন ও আধুনিক অর্থনীতি একই সাথে জাতীয় কল্যাণে অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশে একটি সুসংহত, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হালাল কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা কেবল ধর্মীয় নৈতিকতা রক্ষা করবে না-একটি শক্তিশালী রপ্তানি-শাখা, কর্মসংস্থান ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন দ্বার খুলে দেবে। সময় উপযোগী ও সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাংলাদেশ হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার পরবর্তী ‘হালাল হাব’।
লেখক : কবি, কলামিস্ট, পিএইচডি গবেষক, মালয়েশিয়া

