ফেসবুক-টুইটারের কল্যাণে পৃথিবী ভ্রমণ এখন অনেকটা সহজ হয়ে গিয়েছে। ভার্চুয়ালি ঘুরে আসা যাচ্ছে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে। বেশ কিছুদিন আগে এ রকম ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখলাম উত্তাল সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি সমাধি। প্রথম দেখাই নিজের চোখকে বিশ্বাস করানো কঠিন। উন্মত্ত ঢেউয়ের মধ্যে পাকা সমাধি কি করে ভেসে থাকতে পারে? সবিস্তার পড়ে জানলাম, বছরের পর বছর ধরে ভারতের মুম্বাই শহরে আরব সাগরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এ সমাধি। সমাধিতে শুয়ে আছেন মহান আল্লাহর এক সাধক বান্দা, হযরত হাজী আলী শাহ আল বুখারী (র)। যিনি এক অলৌকিক ঘটনার কারণে মৃত্যুর পর মাটির নিচে কবরে থাকা পছন্দ করেননি, চেয়েছিলেন পানিতেই হোক নিজের শেষ যাত্রা। চাওয়া মতো তাঁকে সাগরের পানিতেই সমাধিস্থ করা হয়। পরে তার সমাধি ভেসে ওঠে আরব সাগরের মুম্বাই অংশে।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মুসলমানরা দেখতে যান সে সমাধি, যা ভেসে আছে সমুদ্রের ওপর। চট্টগ্রাম থেকে বছর তিনেক আগে ১৫ জনের একটা দলের সাথে আমারও যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল সেখানে। আমরা অবশ্য যখন যাই তখন মাজারের সামনের অংশে পানি শুকিয়ে গেছে, পেছনে সমুদ্রের দেখা মিলে। পাথর দিয়ে সেখানে পর্যটকদের জন্য নামার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কলকাতা হয়ে ৩ ঘণ্টার বিমানভ্রমণ শেষে মুম্বাইয়ে ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে আমরা ওঠি ভেন্ডিবাজার নামক এলাকায়। দিল্লীর পর ভারতের দ্বিতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দর এটি। বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১ ঘণ্টার কার জার্নি শেষে পৌঁছায় ভেন্ডিবাজারে, আমাদের জন্য আগে থেকে নির্ধারিত হোটেল কেজিএন-এ। পুরো ভারতে কেজিএন একটি বিখ্যাত চেইন গ্রুপ, তাদের আবাসিক হোটেল ছাড়াও একাধিক রেস্টুরেন্ট রয়েছে। খাজা গরীবে নেওয়াজ-এর সংক্ষিপ্ত রূপ কেজিএন।

স্ট্রিটফুডে লোভ সামলানো দায়
স্ট্রিটফুডের জন্য বিখ্যাত মুম্বাই শহর। ভেন্ডিবাজারেও মিলে শত রকমের স্ট্রিটফুড। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেই লোভনীয় সব খাবারের মনকাড়া স্বাদ আপনাকে হাত নেড়ে ডাকবে যেন। বাংলাদেশের মতো চিকেন শর্মা, চিকেন টিক্কা, কাবাব যেমন আছে তেমন ভারতীয় নানা পদের খাবারও বিক্রি হয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শত শত পুরুষ-মহিলা, বাচ্চারা সেসব স্ট্রিট ফুডে সকাল থেকে রাত অব্দি নাস্তা সারছেন। ভ্যানগাড়িতে নানান রকম বান, ফলও বিক্রি হতে দেখা গেলো। তবে, মজার মনে হয়েছে রাস্তায় বেলুন-পিঁড়ি নিয়ে বসে মহিলারা আটার রুটি বানাচ্ছে দেখে। আমাদের দেশে যেমন ঘরে ঘরে বানানো হয় তেমন। এসব রুটির খদ্দেরও কম নয়। লাইন ধরে দাঁড়িয়ে রুটি কিনছেন ক্রেতারা। মুম্বাইয়ে আমাদের দেশের মতো তেলের বা ছ্যাকা পরটার চল তেমন নেই, আটার রুটি, নানরুটি দেখা যায় বেশ। মুম্বাইও তার ব্যাতিক্রম নয়। ভারী খাবারের পর রাবড়ি, দই আর মিষ্টি জাতীয় খাবার দেখে লোভ সামলানো দায়। যে কদিন ছিলাম মুম্বাইয়ে নিজেকে বেশ ভোজনরসিকই বানিয়ে ফেললাম। দামও তুলনামূলক কম। এক প্লেট ঘন, দারুণ সুস্বাদু রসমালাই কিংবা একটা বিশাল আকাড়ের রাবরি মাত্র ৩০ রুপি। দই কাপ ১৫ রুপি।

ভ্যানে আনারস, সাগর কলা, আপেল, কমলা, আনারসহ নানান ধরণের ফলের সারি। এক গ্লাস ঠাণ্ডা মনজুড়ানো আমের জুস খেলাম মাত্র ২০ রুপিতে। এমন স্বাদের জুস খুব কমই পাওয়া যায়। ছোট-বড় হরেক রকম বান বানানো হচ্ছে গরম গরম। বানিয়ে সেসব সাজিয়ে রাখা হচ্ছে দোকানের সামনে। আমাদের এখানে এখন সেরকম কিছু লাইভ বেকারি দেখা যাচ্ছে। রেস্টুরেন্টেও রুটির পাশাপাশি বানের বেশ কদর। চিকেন-মাটনের নানা পদের সাথে বান খুব চলে এখানে।
খাবার ছাড়াও আমাদের দেশের মতো ফুটপাত জুড়ে নানান ধরণের পণ্যের বিকিকিনি। জামা-জুতা, ব্যাগ-বোরকা, খেলনা সামগ্রী কী নেই? লম্বা ভ্রাম্যমান দোকানের সারি দেখে মনে হবে, এ যেন কোনো গ্রামীণ মেলা। নারী-পুরুষ দরদাম করে একের পর এক কিনছেন প্রয়োজনীয় সব পণ্য।
সুফীসাধক হাজী আলী (র) এর মাজারে
একদিন বিশ্রাম শেষে পরদিনই হযরত হাজী আলী (র) এর মাজারের উদ্দেশে টেক্সি নিয়ে রওয়ানা দিই আমরা। যানজট এড়িয়ে যেতে বেশিক্ষণ লাগেনি। মাথার ওপর কড়া রোদ নিয়ে আন্ডারপাস পার হলেই মাজারের মূল গেট। ভারতের সব মাজারে ঢুকতেই প্রথমে দেখা মিলবে চাদর আর ফুলের দোকানের সারি। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। মাজারে অনেকে নিয়ত করে চাদর আর ফুল দেন, তাই বেশ ভালোই বিকিকিনি হয় এসব দোকানে। হযরত হাজী আলীর মাজারে ফুল আর চাদর ছাড়াও আরও নানা রকমের জিনিসের দেখা মেলে। যেমন চাবির রিং, মেয়েদের ওড়না-হিজাব, টুপি এমনকি বাহারি পানও পাওয়া যাবে মাজারে ঢুকতে ঢুকতে। প্রধান প্রবেশ পথ থেকে মূল গেটে ঢুকতে হাঁটতে হয় ৫ থেকে ৭ মিনিটের মতো। এরপরই কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ওঠলেই মাজার। মূল গেটের ভেতর হাতের ডানে ওয়াশ রুম এবং বিশ্রামাগার, আরেকটু ভেতরে ঢুকলেই জুতা জমা রাখার ব্যবস্থা। তারপর মূল সমাধি, এরপরেই সুসজ্জিত মসজিদ। মসজিদের পেছনে অযু করার ব্যবস্থা, অযু করতে বসলেই পেছনে উত্তাল সমুদ্রের দেখা মিলবে।

হাজী আলী শাহ (র) এর দরগাহর অট্টালিকাটি অসাধারন ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য কৌশলে নির্মিত। মসজিদের ভিতরের সমাধিটি লাল বুটিদার এবং সবুজ চাদর দ্বারা আবৃত। মূল হলঘরটিতে মার্বেল স্তম্ভগুলো শৈল্পিক আয়নার কাজের সঙ্গে বিভিন্ন রঙিন পাথরে অলংকৃত যেখানে আরবিতে আল্লাহর ৯৯টি নাম লেখা। প্রায় ছয়শত বছর পুরোনো এই দরগাহটি প্রতিনিয়ত লবণাক্ত বাতাস এবং সপ্তাহে প্রায় ৮০ হাজার দর্শনার্থীদের কারণে ক্রমাগত ক্ষয় হচ্ছে। দরগাহে প্রবেশ করাটা অনেকটা জোয়ারের ওপর নির্ভরশীল। রেলিং না থাকার কারণে জোয়ারের সময় যখন বাঁধটি ডুবে যায় তখন দরগাহ প্রবেশযোগ্য থাকে না। তবে, আমরা যখন দরগাহে যাই, তখন জোয়ার ছিল না। ফলে দরগাহটি ভ্রমণকারী এবং হাজী শাহের ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। মুসলিম ধর্ম ব্যতিত অন্য সকল ধর্মের মানুষদের জন্যেও জায়গাটি উন্মুক্ত। মানুষ সেখানে বিভিন্ন মানত নিয়ে যায় এবং তাদের মতে ওখানে গিয়ে প্রার্থনা করলে সকল ইচ্ছা পূরণ হয়।
তাজ হোটেল, গেট অফ ইন্ডিয়া
মহারাষ্ট্র মুম্বাই গেলে যে দুটো নান্দনিক স্থাপনা দেখা প্রয়োজন সেগুলো হলো পাঁচতারকা হোটেল তাজমহল প্যালেস হোটেল, যা তাজ হোটেল নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তার ঠিক পাশেই গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া। মুম্বাই সফরের তৃতীয় দিন বিকেলে গেলাম এ দুটি স্থাপনা দেখতে। রোববার সেখানকার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় সেখানে ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। মূল সড়কের পাশেই তাজ হোটেল, ঠিক তার সামনাসামনি বয়ে গেছে আরব সাগরের উপশাখা। পাশাপাশি গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া। ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর লষ্কর-ই-তৈয়বা সেখানে হামলা চালায়। তিনদিনব্যাপী ওই হামলায় দেশি-বিদেশি মিলে ১৬৭ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। এখনও মানুষ সেটি মনে রেখেছে। নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হোটেলটির সামনে পর্যটকরা দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন আর সেদিনের কথাই বলাবলি করছিলেন। বোর্ডার ছাড়া ভেতরে প্রবেশাধিকার না থাকায় চলে গেলাম গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ায়। কোনো ধরনের টিকিটের ব্যবস্থা ছাড়াই শত শত মানুষ প্রতিদিন ভিড় করছে ঐতিহাসিক এ স্থাপনা দেখতে।

গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া হলো পশ্চিম ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের মুম্বাই শহরে ব্রিটিশ ভারতে সময় নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ। এটি দক্ষিণ মুম্বাইয়ের অ্যাপোলো ভান্ডার এলাকার জলাশয়ের তীরে অবস্থিত এবং পাশেই বয়ে চলেছে আরব সাগর। এই স্থাপত্যটি ২৬ মিটার (৮৫ ফুট) ব্যাসল্টের তৈরি একটি তোরণ। এটি মুম্বাই হারবারের জলাশয়ের কিনারায় অবস্থিত ছত্রাপতি শিভাজী মার্গ -এর শেষপ্রান্তে অবস্থিত। এই স্থাপত্যটি প্রথমে জেলে সম্প্রদায়ের স্থানীয় জেটি হিসেবে ব্যবহৃত হত এবং পরবর্তীতে এটিকে সংস্কার করা হয়। ব্রিটিশ সরকার ও অন্যান্য প্রখ্যাত ব্যাক্তিদের অবতরণস্থান হিসেবে এটি ব্যবহার হত।

প্রথম দিকে, কেউ মুম্বাই নৌকায় করে এলে এই স্থাপত্যটি প্রথমে দেখতে পেত। নয়াদিল্লীর ইন্ডিয়া গেট দেখতে এই স্থাপত্যের মতই। এই স্থাপত্যটি নির্মাণ করা হয়েছিল কিং জর্জ ফাইভ এবং কুইন ম্যারি এর ১৯১১ সালে অ্যাপোলো ভান্ডার আগমনের স্মৃতি রক্ষার্থে। ইন্দো সারাসেনিক স্টাইলে নির্মিত, এই স্থাপত্যর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ৩১ মার্চ, ১৯১১। জর্জ উইট্টেট এর চূড়ান্ত নকশা ১৯১৪ সালে পাশ হয়েছিল এবং স্থাপত্যের কাজ ১৯২৪ সালে শেষ হয়েছিল। পরবর্তীতে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া দিয়ে ভাইসরয় এবং বোম্বের তৎকালীন নতুন সরকার উৎসবমুখর পরিবেশে প্রবেশ করেছিলেন। স্থাপত্যটি থেকে ভারত প্রবেশের অনুমতি দেয়া হত।
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া দেখতে আসা পর্যটকদের জন্য নানান রকম বিনোদন ও বিশ্রামের ব্যবস্থা রয়েছে। গেটের পাশে বসার জন্য পাকা বেঞ্চ করে দেয়া হয়েছে, মানুষ ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেলে এখানে এসে বসতে পারে। রয়েছে নৌকাভ্রমণ, স্পিডবোটে করে আরব সাগরে ঘুরার ব্যবস্থা। দর্শনার্থীদের বেশ উচ্ছ্বাস নিয়েই এসব পর্যটন এলাকা পরিভ্রমণ করতে দেখা গেলো।
শাহরুখ খানের বাড়ি
মুম্বাই যাবেন আর শাহরুখ খানের বাড়ি দেখবেন না, এ যেন হয় না। বলিউড বাদশাহ যেমন পৃথিবীব্যাপী জনপ্রিয়, তার বাড়িও তেমন স্থানীয় আর পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণের জায়গা। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া দেখে বের হতেই ট্যাক্সি চালকরা ডাকবে আপনাকে, তাই ভুলে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। বান্দ্রার বাসস্ট্যান্ডের প্রায় শেষ দিকে বলিউড কিং শাহরুখ খানের বাড়ির গেট। তাঁর বাড়ির নাম মান্নাত। এই মান্নাত এখন শুধু একটি বাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি বিশাল গ্রুপ। মান্নাত গ্রুপের হোটেল-রেস্টুরেন্ট আছে পুরো ভারতজুড়েই। এটি মূলত বাংলো। যেতে যেতে ট্যাক্সি ড্রাইভার বাড়িটি সম্পর্কে বেশ কিছু ধারণা দিলেন।

তবে, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে ইয়েস বস ছবির শুটিংয়ের পরপরই ভিলা ভিয়েনা নামে বাংলোটি কিনে নেন শাহরুখ খান। গেটের বাইরে আসনা পর্যপকেরা শুধুই চবি তুলতে পারছেন, ভেতরে প্রবেশের সুযোগ নেই। তবে, নিজের জন্মদিনে কিংবা কোনো কোনো সকাল বেলা বের হওয়ার আগে কিং খান বারান্দা থেকে ভক্তদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান এতটুকুতেই খুশি ভক্তরা।
মুম্বাই ভারতের বাণিজ্য ও বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র। এখানে গেলে দেখার আছে অনেক কিছু। তবে তার জন্য যথেষ্ট সময় প্রয়োজন। পর্যটন এলাকা ছাড়াও চাইলে টাইলস তৈরির কারখানা, নান্দনিক নানা মসজিদ-মন্দিরের দেখাও মিলবে মুম্বাইয়ে। সংক্ষিপ্ত যাত্রা শেষ করে রওয়ানা দিলাম বরফের স্বর্গরাজ্য কাশ্মীরে।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, পতাকানিউজ

