ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিহত অথবা গুরুতর আহত হতে পারেন—এমন একটি দাবি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। ইরানের আধা–সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি এই সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি অস্বাভাবিক ঘটনার প্রেক্ষিতে নেতানিয়াহুকে ঘিরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে গত কয়েক দিনে তার প্রকাশ্য উপস্থিতির অভাব এবং সামাজিক মাধ্যমে কার্যত নীরবতা এই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন দিন ধরে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত প্রচারমাধ্যম বা যোগাযোগ চ্যানেলে কোনো নতুন ভিডিও প্রকাশিত হয়নি। একই সময়ে জনসমক্ষে তার নতুন কোনো ছবিও দেখা যায়নি। এ ছাড়া ওই সময়ের মধ্যে তার নামে যে কয়েকটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলো সবই লিখিত আকারে এসেছে।
তাসনিম বলছে, নেতানিয়াহুর যোগাযোগ কার্যক্রমে এই ধরনের বিরতি আগে খুব একটা দেখা যায়নি। সাধারণত তিনি নিয়মিত ভিডিও বার্তা প্রকাশ করতেন এবং অনেক সময় দিনে একাধিক ভিডিও সামনে আসত। সেই ধারাবাহিকতার হঠাৎ বিচ্ছেদই সন্দেহের সূত্রপাত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদারের খবর
ইরানি সংবাদমাধ্যমটি আরও দাবি করেছে, কিছু হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী ৮ মার্চ থেকে নেতানিয়াহুর বাসভবনের আশপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ঘিরে নিরাপত্তা বলয় আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত করা হয়েছে।
এই নিরাপত্তা জোরদারের ঘটনাও তাসনিমের প্রতিবেদনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক হামলার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সে বিষয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে।
কূটনৈতিক সফর বাতিলের বিষয়টিও আলোচনায়
তাসনিমের প্রতিবেদনে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের নির্ধারিত ইসরায়েল সফর হঠাৎ বাতিল হওয়া।
এই সফর বাতিলের বিষয়টি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা সামনে না আসায় বিষয়টি নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এছাড়া ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং নেতানিয়াহুর মধ্যে কথিত ফোনালাপ সংক্রান্ত একটি বিবৃতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাসনিম বলছে, ফ্রান্সের পক্ষ থেকে ওই আলোচনার কথা জানানো হলেও নির্দিষ্ট দিন বা সময় উল্লেখ করা হয়নি—যা কিছু পর্যবেক্ষকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার ঝড়
নেতানিয়াহুকে ঘিরে এই জল্পনা সামাজিক মাধ্যমেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তাসনিমের প্রতিবেদনে সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্কট রিটারের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে করা একটি পোস্টের উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই পোস্টে দাবি করা হয়, ইরানের হামলায় নেতানিয়াহুর একটি গোপন অবস্থানস্থল ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সেই ঘটনায় তার ভাই নিহত হয়েছেন।
তবে তাসনিম নিজেই স্বীকার করেছে, এই দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি যে এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টটি করা হয়েছে সেটি সত্যিই স্কট রিটার ব্যবহার করেন কি না—তাও নিশ্চিত নয়।
নিশ্চিত তথ্যের অভাব
তাসনিম নিউজ এজেন্সি তাদের প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করেছে যে নেতানিয়াহুর আহত বা নিহত হওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি। বরং তারা বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক ঘটনার ভিত্তিতে সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছে।
এ কারণে বিষয়টি এখনো জল্পনার পর্যায়েই রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া
অন্যদিকে ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমগুলো এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশেষ করে টাইমস অব ইসরায়েল বলেছে, তাসনিমের প্রতিবেদনের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
তাদের দাবি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ৭ মার্চ নেতানিয়াহুর নামে একটি সরকারি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৬ মার্চ দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বিরশেবায় একটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন তিনি।
ইসরায়েলি সূত্রগুলো বলছে, এই তথ্যই প্রমাণ করে যে নেতানিয়াহু স্বাভাবিকভাবেই তার দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাকে ঘিরে যে জল্পনা ছড়ানো হচ্ছে তা ভিত্তিহীন।
এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও বলছেন, কোনো নেতার মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়ার মতো সংবেদনশীল তথ্য সাধারণত দ্রুত এবং স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়। ফলে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায় এই খবরকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির কারণে গুজব ও জল্পনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
-সূত্র : তাসনিম নিউজ
-পতাকানিউজ

