নেত্রকোণার আকাশে আজ সন্ধ্যার বাতাসে ভাসছে শোকের মেঘ। বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, প্রাবন্ধিক ও বাম রাজনীতির পুরাধা ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক যতীন সরকারের মরদেহ ফিরছে তার প্রিয় জনপদে—শেষবারের মতো মানুষের ভালোবাসা গ্রহণ করতে।
ময়মনসিংহ থেকে মরদেহ পৌঁছাবে প্রথমে শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ‘বানপ্রস্থে’। এই বাড়ি, আড়াই দশকের বেশি সময়ের সঙ্গী, হবে তাঁর নীরব বিদায়ের প্রথম থামা। পরিবারের অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা শেষে রাত ৮টায় যাত্রা হবে নেত্রকোণার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পথে—যেখানে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, ময়মনসিংহ ও ঢাকা থেকে আসা ভক্ত-অনুরাগীরা তাকে শেষবারের মতো সম্মান জানাবেন। রাত ১১টায় বারহাট্টা রোডের কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে শেষকৃত্য।
১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দ্রপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া যতীন সরকার শৈশবেই দেখেছেন আর্থিক অনটন। কৈশোরে টিউশন করে টেনে নিয়েছেন শিক্ষা জীবন। ছাত্রজীবনেই সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া থেকে শুরু, আনন্দমোহন কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ, আর পরবর্তীতে নাসিরাবাদ কলেজে দীর্ঘ চার দশকের শিক্ষকতা—সবকিছুতেই জ্বলজ্বল করেছে এক নির্ভীক বুদ্ধিজীবীর দীপ্তি।
১৯৬০-এর দশক থেকে তিনি শুধু শিক্ষক নন—তিনি হয়ে উঠেছেন এক চিন্তার বাতিঘর। তাঁর বক্তৃতা মোহাবিষ্ট করত সাধারণ মানুষকে, তাঁর লেখনী ভাঙত পুরনো চিন্তার খোলস।
পঞ্চাশের দশকে কমরেড জ্যোতিষ বোস ও অজয় রায়ের কাছ থেকে মার্কসবাদের দীক্ষা নেন তিনি। ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ থেকে শুরু করে ‘পাকিস্তানের জন্ম মৃতু-দর্শন’, ‘বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, ‘মানবমন, মানবধর্ম ও সমাজবিপ্লব’—আড়াই ডজনের বেশি গ্রন্থে তিনি মিলিয়েছেন রবীন্দ্র-নজরুলের মানবতাবাদ, মার্কসবাদ আর বাংলার লোকজ জীবনদর্শন।
২০১০ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার, ২০০৮ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর প্রকৃত স্বীকৃতি ছিল মানুষের হৃদয়ে—যেখানে তিনি ছিলেন শিক্ষক, পথপ্রদর্শক, বন্ধু।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেছেন—‘আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাইনি, হারিয়েছি এক আদর্শকে, এক অনুপ্রেরণাকে। সত্যিই, যতীন সরকারের মৃত্যুতে জাতির চিন্তাজগতে সৃষ্টি হয়েছে এক অপূরণীয় শূন্যতা।’
নাসিরাবাদ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত এই অধ্যাপক জীবনের শেষদিন পর্যন্ত যুক্তিবোধ, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তার বীজ বপন করেছেন সমাজের প্রতিটি স্তরে। আজ তার প্রয়াণ শুধু নেত্রকোণার নয়, গোটা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে গভীর দুঃখের ঢেউ তুলেছে।
রাতের আঁধারে যখন নেত্রকোণা শহরের পথে তার শেষযাত্রা এগোবে, তখন বাতাসে ভেসে আসবে তার অদম্য কণ্ঠের প্রতিধ্বনি—‘মানুষের মুক্তিই আমার চূড়ান্ত বিশ্বাস’। আর সেই বিশ্বাস, তাঁর মতো করেই, আলো জ্বালিয়ে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
পতাকানিউজ/এনটি

