চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এবার যাত্রা শুরুর অপেক্ষা ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ -এর। দুর্বল পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে এখন দেশের সবচেয়ে বড় ও সরকারি ইসলামী ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করবে। রবিবার, ৩০ নভেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড সভা। এরপর নিয়োগ দেয়া হয় নতুন চেয়ারম্যান। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াকে।
গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর শিল্পগ্রুপ এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৫ দুর্বল ব্যাংককে একত্রিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ব্যাংকগুলো হলো, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। এই পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই নতুন ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করবে। তবে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে ব্যাংকটি ছেড়ে দেয়া হবে বেসরকারি মালিকানায়। কিন্তু ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দুবছরেই ব্যাংকটির ওপর আস্থা ফেরানো চ্যালেঞ্জিং।

মূলত অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে বের করা বেশিরভাগ অর্থ পাচারের কারণেই ভঙ্গুর হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলো। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আপাতত সরকারের পক্ষ থেকে পরিচালিত হবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। তবে কার্যক্রম শুরুর পর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই বেরসকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার পরিকল্পনা অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের। সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসে এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানান তিনি।
দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকটি নিয়ে সিনিয়র ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, আগে আস্থা ফেরাতে হবে গ্রাহকের। আর বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে রাজনৈতিক সরকারের ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংকটি আগামী সপ্তাহেই যাত্রা শুরু করতে পারে। তিনি আরও বলেন, নতুন ব্যাংকটি ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধ মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। যার মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে সর্বোচ্চ দেড় হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের ব্যাংক রয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, দুই বছরে ব্যাংকটি হয়ত দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে দুই বছরে দাঁড়ানো খুবই কঠিন। আগে গ্রাহকদের আস্থা আনতে হবে। নতুন ডিপোজিট তখনই আসবে, যখন পুরনো গ্রাহকরা তাদের টাকা ঠিক মতো পাবে। কিন্তু সেটা না হলে তো নতুন ডিপোজিট আসবে না। আরেকটা জিনিস এখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হচ্ছে ব্যাংকের কর্মীদের কী হবে! তাদেরকে বলা হচ্ছে, এডমিনিস্ট্রেটর দেয়া হচ্ছে, এক বছরে তার সব ঠিক করবেন। এরপর বলা হচ্ছে, শেয়ার মার্কেটে দেয়া হবে। নতুন শেয়ার, এটা পাবলিক হবে। এগুলো কিন্তু স্বপ্ন! এগুলো বাস্তবে এত তাড়াতাড়ি করা সম্ভব না।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ বলেন, যেহেতু একটা দীর্ঘমেয়াদী এবং একটা পলিসি কনসিস্টেন্সির বিষয় আছে, তাই এ বিষয়ে এখনই কিছু বলাটা কঠিন। কারণ সামনের চ্যালেঞ্জটা কীভাবে অতিক্রম করবে, পরবর্তী সরকার এটাকে কীভাবে দেখবে- সেটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।

আর্থিক খাতের সংস্কার দৃশ্যমান করতে অঙ্গীকারবদ্ধ অন্তর্বর্তী সরকার। তবে ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে পরিবর্তন এলেও সংকটে থাকা নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর আগে গত ৯ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ -এর প্রাথমিক অনুমোদন দেয়া হয়। যেখানে যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজিএসসি) থেকে কোম্পানি নাম ছাড়পত্র, ব্যাংকের চলতি হিসাব খোলাসহ ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধি-বিধান পূরণের দায়িত্ব পড়ে সরকারের ওপর।
রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের মাধ্যমে ব্যাংকটির কার্যক্রম শুরু হলো। শিগগিরই আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ, সুদের হার, বেতন স্কেলসহ বিস্তারিত স্কিম নির্ধারণ করার ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এর আগে গত সপ্তাহে এসব ব্যাংকের কর্মীদের বেতন-ভাতা ২০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া সরকার থেকে মূলধন জমা করার জন্য নতুন ব্যাংকের নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি চলতি হিসাব খোলা হয়েছে। একীভূত ব্যাংকে সাধারণ আমানতকারীরা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে।
পতাকানিউজ/কেএস

