মানুষের আত্মিক প্রশান্তি, নৈতিক দৃঢ়তা ও ঈমানী শক্তি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান উপায় হলো আল্লাহর যিকির—অর্থাৎ হৃদয়, জিহ্বা ও কর্মে মহান আল্লাহকে স্মরণ করা। যিকির ইসলামের এমন এক বিধান, যা কেবল একটি আমল নয়; বরং মুমিনের অন্তরের জীবন। কোরআনুল কারিমে বহু স্থানে যিকিরের গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে এবং রাসুলুল্লাহ (দ) তাঁর অসংখ্য হাদীসে যিকিরের মর্যাদা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
কোরআনের আলোকে যিকিরের গুরুত্ব
১. যিকিরে হৃদয় প্রশান্ত হয়
আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘জেনে রাখো! আল্লাহর যিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮)। মানুষের জীবনে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা দূর করার অন্যতম সহজ উপায় হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ করা। কোরআন স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে—হৃদয়ের প্রকৃত শান্তি জাগতিক স্বাচ্ছন্দ্যে নয়, বরং আল্লাহর স্মরণে।
২. যিকিরকারীদের জন্য মহান পুরস্কার
আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘পুরুষ ও নারী যারা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহান পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।’ (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩৫)। এ আয়াতে যিকিরকে তাকওয়া, সত্যবাদিতা, ধৈর্য ও নম্রতার সঙ্গে সমমর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যা যিকিরের বিশাল ফজিলত নির্দেশ করে।
৩. যিকির মুমিনের পরিচয়
আরও ইরশাদ হয়েছে— ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো।’ (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪১)। এ আয়াত প্রমাণ করে যে প্রকৃত মুমিনের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হওয়া উচিত যিকির।
৪. শয়তান থেকে নিরাপত্তা
আল্লাহ বলেন— ‘যে ব্যক্তি রহমানের স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, আমি তার ওপর এক শয়তান চাপিয়ে দিই; সে তার সঙ্গী হয়ে যায়।’ (সূরা যুখরুফ, ৪৩:৩৬)। অর্থাৎ যিকির মানুষকে শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করে এবং পাপের পথ থেকে দূরে রাখে।
হাদীসের আলোকে যিকিরের গুরুত্ব
১. যিকির সেরা আমল
হজরত আবু মূসা আশআরী রা. থেকে বর্ণিত— রাসুলুল্লাহ (দ) বলেন- ‘সব আমলের মধ্যে আল্লাহর স্মরণই সর্বোত্তম।’ (তিরমিজি, হাদীস ৩৩৭৭)
২. যিকিরকারী ও যিকিরহীন মানুষের পার্থক্য
রাসুলুল্লাহ (দ) বলেন— ‘যে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং যে স্মরণ করে না—তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃতের মতো।’ (বুখারি, হাদীস ৬০৪৪)। এর দ্বারা বোঝা যায়, যিকির বান্দার আত্মাকে জীবিত রাখে এবং ঈমানকে চাঙ্গা করে।
৩. আল্লাহর ছায়ায় আশ্রয় লাভের উপায়
হাদীসে এসেছে— ‘সাত শ্রেণির মানুষের মধ্যে একজন হবেন সেই ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়।’ (বুখারি, হাদীস ৬৬০)। কেয়ামতের কঠিন দিনে এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাঁর বিশেষ রহমতের ছায়ায় রাখবেন।
৪. জিকিরে গুনাহ মাফ হয়
রাসুলুল্লাহ (দ) বলেছেন— ‘যে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ একশ বার পড়বে, তার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যতই হোক না সমুদ্রের ফেনার সমান।’ (মুসলিম, হাদীস ২৬৯১)
যিকিরের বিভিন্ন রূপ
ইসলামে যিকির কেবল জিহ্বার শব্দ নয়; বরং— হৃদয়ে আল্লাহর মহত্ত্ব অনুভব করা। জিহ্বায় তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির উচ্চারণ। কর্মে আল্লাহর বিধান মেনে চলা। কোরআন তিলাওয়াত করা। এসবই যিকিরের অন্তর্ভুক্ত।
যিকিরের উপকারিতা সংক্ষেপে
১. অন্তরে প্রশান্তি আসে
২. ঈমান শক্তিশালী হয়
৩. গুনাহ মাফ হয়
৪. দুশ্চিন্তা দূর হয়
৫. সৎকর্মের প্রতি আগ্রহ বাড়ে
৬. শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়া যায়
৭. কেয়ামতের দিন মহান পুরস্কার লাভ হয়
আল্লাহর যিকির শুধু ইবাদতের অংশ নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ করে তোলার মাধ্যম। যে মুমিন দিনের শুরু, চলার পথে, কাজের মাঝে এবং রাতের প্রশান্ত নীরবতায় তার রবকে স্মরণ করে, আল্লাহ তাকে বিশেষ রহমত, বরকত ও অন্তরের শান্তি দান করেন। বর্তমান দ্রুতগতির জীবনে যখন মানুষ উদ্বেগ ও অস্থিরতায় ভুগছে, তখন যিকিরই হতে পারে আত্মার প্রকৃত প্রশান্তির উৎস।
লেখক : সাজ্জদানশীন, মানযারে আউলিয়া দরবার শরীফ, নীলফামারী
পতাকানিউজ/কেএস

