যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করতে ইরান চীনের তৈরি স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক গণমাধ্যম ফিন্সিয়াল টাইমসের খবর এই তথ্য প্রচার হওয়ার পর তোলপাড় শুরু হয়েছে।
আর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও যেন ‘মিনমিনে’ কণ্ঠের হয়ে গেছেন। কারণ, তিনি সময়ে সময়ে ধারাবাহিকভাবে ইরানকে হুমকি দিলেও হরমুজ প্রণালিতে এখনো সংঘাতে জড়াননি। হরমুজ অবরোধের নামে আশপাশে মার্কিন জাহাজ মোতায়েন করেছেন তিনি। এরই মধ্যে চীন এবং ইরানের জাহাজ হরমুজ পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়নি।
ধারণা করা হচ্ছে, চীনা স্যাটেলাইট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা ও যুদ্ধ সরঞ্জাম লক্ষ্যবস্তু বানানোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই টের পেয়েছে। এই কারণে নিজদের সম্পদ না হারিয়ে শুধু ইরানকে ভয় দেখাতেই অবরোধ এবং যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করেছেন ট্রাম্প। তিনি যুদ্ধ বিরতি বাড়াতে চাইছেন না। আবার খুব শিগগিরই ‘চুক্তি’ হবে বলে আশা করছেন।
সবমিলিয়ে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের কাছে গোয়েন্দা স্যাটেলাইট থাকার বিষয়টি টের পেয়েই যুদ্ধবাজ ট্রাম্প এখন কণ্ঠ নিচু করেছেন। তিনি যদি চীনের জাহাজ চলাচলের সময় হরমুজে আক্রমণ করতেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজকে ইরান লক্ষ্যবস্তু বানাতো-এটা নিশ্চিতভাবেই বুঝেছেন ট্রাম্প। আবার চীনও নিজদের জাহাজ অবরোধের মধ্যেই হরমুজ পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে। এই ঝুঁকি নেওয়ার অর্থ হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলেই পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ ধ্বংসের মতো কাজ করতে পারে ইরান। ইতোমধ্যেই ইরানকে সেই সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
চীনের স্যাটেলাইট ইরানের হাতে পৌঁছার বিষয়টি যুদ্ধের মোড় ঘোরানো ইঙ্গিত বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সও এই বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কিন্তু রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা তথ্যটি শতভাগ যাচাই করতে পারেনি।
নথি ফাঁস
ফাঁস হওয়া ইরানি সামরিক নথির বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘টিইই–০১বি’ নামের স্যাটেলাইটটি তৈরি ও উৎক্ষেপণ করে বেইজিংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আর্থ আই। পরে ২০২৪ সালের শেষদিকে এর নিয়ন্ত্রণ নেয় ইরানের প্রভাবশালী সামরিক শাখা আইআরজিসি‘র অ্যারোস্পেস ইউনিট।
অভিযোগ রয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনার ওপর নজরদারির জন্য এই স্যাটেলাইট ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চে বিভিন্ন স্থানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে এবং পরে লক্ষ্যবস্তুগুলোর ছবি তোলা হয়েছিল এই স্যাটেলাইট থেকেই।

বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, সৌদি আরবে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান এয়ার বেস এর ওপর নজরদারি চালানো হয়েছিল হামলার ঠিক আগে। এছাড়া জর্ডান, বাহরাইন ও ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকেও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান বেইজিংভিত্তিক আরেক প্রতিষ্ঠানের গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। এর ফলে এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্যাটেলাইটের তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সক্ষমতা ইরানের সামরিক গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র। চীনও নিশ্চুপ থাকলেও পরে বলেছে এটিকে ‘বানোয়াট অপপ্রচার’ বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের এক সতর্কবার্তার কথাও সামনে এনেছে। তিনি একসময় বলেছিলেন, ইরানকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সরবরাহ করা হলে তা চীনের জন্য বড় কূটনৈতিক সমস্যার কারণ হতে পারে। নতুন এই তথ্য সেই আশঙ্কাকেই আবার আলোচনায় এনে দিয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এখন আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম প্রধান উপাদান। উচ্চ রেজোলিউশনের নজরদারি সক্ষমতা থাকলে শত্রুপক্ষের ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি বা ক্ষেপণাস্ত্র অবস্থান শনাক্ত করা সহজ হয়ে যায়। ফলে সংঘাতের আগে কৌশলগত পরিকল্পনা করা অনেক বেশি নির্ভুল হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সহযোগিতা প্রমাণিত হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

গণমাধ্যম এখনো তথ্যটি শতভাগ নিশ্চিত করতে না পারলেও বাস্তবতা বিবেচনায় বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, ইরান ঠিকই স্যাটেলাইট ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি আছে, সেগুলোতে ইরান অনেকটা নিখুঁতভাবে হামলা চালায়। এতে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ‘যুক্তরাষ্ট্রের চোখ’ কার্যত অন্ধ হয়ে গেছে। এমন নিখুঁত হামলার পর যুদ্ধের শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা ইরান কেউই বিষয়টি স্বীকার করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র মন্তব্য না করলেও দেশটি যে ইরানের নিখুঁত হামলার বিষয়ে গভীর চিন্তিত সেটা বেশ স্পষ্টভাবেই বোঝা গেছে সবশেষ হরমুজ প্রণালি অবরোধের সময় চীন এবং ইরানের জাহাজ হরমুজ পাড়ি দেওয়ার মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এখানে হামলা করতো, তাহলে পরিণতি কি হতো যুক্তরাষ্ট্রই সেটা অনুধাবন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। সমরবিদদের মতে, ইরানের হাতে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির চীনা সুবিধা থাকা মানেই, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের জন্য বিপদ আরো বৃদ্ধি পাওয়া। কারণ, ইরান যে পাল্টা আঘাত করে সেটা ৪০ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে বুঝিয়ে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র : ফিন্সিয়াল টাইমস ও রয়টার্স
-পতাকানিউজ

