যুক্তরাষ্ট্রে চলমান সরকারি কার্যক্রম বন্ধ বা শাটডাউন জেরে দেশজুড়ে বিমান চলাচলে ব্যাপক অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। শনিবার একদিনেই এক হাজার পাঁচ শতাধিক ফ্লাইট বাতিল এবং আরও কয়েক হাজার ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন—এফএএ, নিরাপত্তা মান বজায় রাখতে বিমান চলাচল অস্থায়ীভাবে ১০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দিয়েছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়ারের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, শুক্রবার ১ হাজার ২৫টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছিল, আর শনিবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৩০টিতে। রবিবারেও এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল; ইতিমধ্যে আরও এক হাজার ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এফএএ জানিয়েছে, দেশজুড়ে অন্তত ৪২টি বিমানবন্দর টাওয়ারে কর্মী সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে আটলান্টা, নিউয়ার্ক, সান ফ্রান্সিসকো, শিকাগো ও নিউইয়র্কসহ ১২টি প্রধান শহরের ফ্লাইট বিলম্বিত হচ্ছে।
এছাড়া ছয়টি উচ্চ-চাপযুক্ত আকাশপথেও একই অবস্থা। শনিবার প্রায় ৬ হাজার ফ্লাইট এবং শুক্রবার ৭ হাজার ফ্লাইট দেরিতে উড়েছে। এফএএ গত শুক্রবার থেকেই ৪০টি বড় বিমানবন্দরে দৈনিক ফ্লাইটের ৪ শতাংশ হ্রাসের নির্দেশ দিয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার এই হার ৬ শতাংশে উঠবে এবং ১৪ নভেম্বর থেকে ১০ শতাংশে পৌঁছাবে।
এই শাটডাউন এখন রেকর্ড ৩৯ দিনে গড়িয়েছে। এফএএর আকাশ নিয়ন্ত্রকসহ হাজারো সরকারি কর্মচারী বেতন পাচ্ছেন না। প্রায় ১৪ হাজার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার এবং ৫০ হাজার নিরাপত্তা কর্মকর্তা বাধ্য হয়ে বেতন ছাড়া কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, কারণ তাদের “অত্যাবশ্যক কর্মী” হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অনেকেই টানা দ্বিতীয় বেতন পর্বেও কোনো পারিশ্রমিক পাবেন না বলে জানানো হয়েছে।
শনিবার এফএএ নয়টি বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড ডিলে প্রোগ্রাম চালু করেছে— শুধু আটলান্টা বিমানবন্দরে ফ্লাইট দেরি হয়েছে গড়ে ২৮২ মিনিট বা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই কাটছাঁটে যুক্তরাষ্ট্রের চারটি বড় এয়ারলাইনস—আমেরিকান, ডেল্টা, সাউথওয়েস্ট এবং ইউনাইটেড—মোট ৭০০ ফ্লাইট বাতিল করেছে।
শনিবারও সমানসংখ্যক ফ্লাইট বাতিল করা হয় এফএএর নির্দেশে। তবে কর্মী সংকটের কারণে তাদের আরও অতিরিক্ত ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। এফএএ প্রশাসক ব্রায়ান বেডফোর্ড জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ কন্ট্রোলার কর্মস্থলে উপস্থিত হচ্ছেন না, ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। তার ভাষায়— “আমরা বিমান চলাচলে চাপের সংকেত পাচ্ছি। তাই অগ্রিম ব্যবস্থা হিসেবে এই কাটছাঁট করা হচ্ছে, যেন নিরাপত্তা মান বজায় থাকে।”
ওয়াশিংটনভিত্তিক বাইপার্টিজান পলিসি সেন্টার জানিয়েছে, মোট ৭ লাখ ৩০ হাজার ফেডারেল কর্মী বর্তমানে বেতন ছাড়াই কাজ করছেন, আরও ৬ লাখ ৭০ হাজার কর্মীকে সাময়িকভাবে ছুটি পাঠানো হয়েছে।
এই বিশৃঙ্খলা ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের ওপরই চাপ তৈরি করেছে, দ্রুত শাটডাউন শেষ করতে। কিন্তু দুই দল এখনো সরকারি বাজেট পাসে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। ডেমোক্র্যাটরা বলছে—এই অচলাবস্থার জন্য দায়ী রিপাবলিকানদের অনমনীয় অবস্থান|বিশেষ করে স্বাস্থ্যবিমা ভর্তুকি নিয়ে আলোচনা প্রত্যাখ্যান করায়।
এর মধ্যেই আসছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যস্ত ভ্রমণ মৌসুম—থ্যাঙ্কসগিভিং, এরপর বড়দিন ও নববর্ষের ছুটি। এই সময় ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিল অব্যাহত থাকলে লক্ষাধিক যাত্রী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, বাণিজ্যিক ফ্লাইটের ওপরও বড় প্রভাব পড়বে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে অনেক যাত্রীবাহী বিমানই একসঙ্গে মালবাহী বিমান হিসেবেও কাজ করে। এলিভেট এভিয়েশন গ্রুপের সিইও গ্রেগ রেইফ বলেছেন— “এই শাটডাউনের প্রভাব পড়বে সর্বত্র। কার্গো ফ্লাইট থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক ভ্রমণ, এমনকি পর্যটন খাতেও। হোটেল ট্যাক্স, সিটি ট্যাক্স—সবখানে এর অভিঘাত পড়বে। এটা এক ধরনের ডোমিনো ইফেক্ট, যা গোটা অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ শাটডাউন এখন শুধু রাজনীতি নয়— বরং নাগরিক জীবনের প্রতিটি শাখায় চাপিয়ে দিচ্ছে অচলাবস্থা আর অনিশ্চয়তা।
-পতাকানিউজ/এসএমআর

