ইরান বর্তমানে দুর্বল অবস্থানে থাকলেও দেশটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক হামলা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, ইরানের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর সরাসরি আঘাত এলে তেহরান প্রতীকী নয়, বরং অর্থবহ ও শক্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং ২০২০ সালে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানি হত্যার পর ইরানের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক সীমিত ছিল। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ চালালেও ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে আরও অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্র ও পুরো অঞ্চলকেই চরম মূল্য দিতে হতে পারে।
স্টিমসন সেন্টারের বিশিষ্ট গবেষক বারবারা স্লাভিন বলেন, “সব বিকল্পই ভয়াবহ। আপনি যদি ‘এ’ বা ‘বি’ করেন, তার পরিণতি কী হবে—তা বোঝা খুব কঠিন। বিশেষ করে যদি শাসকগোষ্ঠী মনে করে তারা কোণঠাসা, তাহলে তারা অঞ্চলে থাকা মার্কিন সেনা ও মিত্রদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।”
বছরের শুরু থেকে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে। ২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের গুলি করে হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘তাদের উদ্ধার করতে প্রস্তুত’।
পরবর্তী দুই সপ্তাহে তিনি একই হুমকি একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করেন এবং বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানান। তিনি আশ্বাস দেন, “সহায়তা আসছে।”
তবে সরকারের কঠোর দমন অভিযানে প্রাণহানির সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে বলে দাবি করেছে বিভিন্ন অধিকার সংগঠন। ইরানে ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পর ট্রাম্পের বক্তব্যে কিছুটা নমনীয়তা দেখা যায়।
তিনি বলেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা গুলি চালাচ্ছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনী পাল্টা গুলি চালিয়েছে। একই সঙ্গে তাঁরা আশ্বাস দিয়েছে, কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে না। দুই দিন পর ট্রাম্প জানান, নির্ধারিত ৮০০টি মৃত্যুদণ্ড বাতিল করায় তিনি ইরানের প্রতি ‘শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করছেন।
কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আপাতত বিক্ষোভ কিছুটা স্তিমিত হতে পারে। তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি যাচাই করা কঠিন। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, সংকট শেষ হয়নি। যেকোনো সময় আবার বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সামরিক বিকল্পও পুরোপুরি বাতিল করেননি ট্রাম্প।
মার্কিন গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়াতে শুরু করেছে। এর মধ্যে একটি বিমানবাহী রণতরী বহরের মোতায়েনও রয়েছে।

এর আগে আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি হত্যা, সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মতো পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এমনকি চলতি মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের নির্দেশও দেন তিনি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানে দ্রুত সামরিক সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বারবারা স্লাভিন বলেন, “এটা ভেনেজুয়েলা নয়। এখানে একবারে কাজ শেষ হওয়ার সুযোগ নেই।”
মাত্র দুই মাস আগে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কূটনৈতিক ও সামরিক মনোযোগ কমানোর কথা বলা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, জ্বালানি ও সংঘাতের কারণে অঞ্চলটি আর আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে বিশ্বাসী।
তবে বিশ্লেষক ট্রিটা পার্সির মতে, বিক্ষোভ দমনে ইরানের কঠোর অবস্থানের কারণে ট্রাম্প কার্যত ‘মানবিক হস্তক্ষেপবাদী’ হয়ে পড়তে পারেন। পার্সি বলেন, “ভেনেজুয়েলায় যা হয়েছে, ইরানে তা একইভাবে সম্ভব নয়। এখানে বিপুল সামরিক শক্তি প্রয়োজন হবে।”
ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া
২০২৫ সালের জুনে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ইরান কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এবার তেহরান আর সহনশীল থাকবে না—এমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
পার্সির ভাষায়, “ইরান যুদ্ধ জিততে না পারলেও তাদের লক্ষ্য ভিন্ন হতে পারে—দীর্ঘ সংঘাতের মাধ্যমে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা।”
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক নাইসান রাফাতি বলেন, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে ইরান অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। ফলে সীমিত মার্কিন হামলাও তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে।
সংকটে ইরান
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা পেরিয়ে টিকে থাকলেও বর্তমানে ইরান তার ৪৭ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন এবং ভেনেজুয়েলায়ও ইরান তার ঘনিষ্ঠ মিত্র হারিয়েছে। সামরিকভাবে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচিও বড় ধাক্কা খেয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মূল্য ৯০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। বিক্ষোভ দমনের কঠোরতায় সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কূটনীতির সুযোগ কি আছে?
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম ইরানে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে উপসাগরীয় মিত্ররা অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় হামলার বিরোধিতা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব একটি বড় বিষয়।
ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ কূটনৈতিক সমাধানের আশা প্রকাশ করে ইরানের সামনে শর্ত দিয়েছেন—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, মিসাইল কর্মসূচি সীমিত করা এবং হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব শর্ত কার্যত আত্মসমর্পণের শামিল। পার্সির ভাষায়, বর্তমান অবস্থানে কূটনীতির সফলতা নিয়ে তিনি আশাবাদী নন।
ইরান বরাবরের মতো বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করছে এবং যেকোনো বহিরাগত হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবে বারবারা স্লাভিনের মতে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান সমঝোতায় যেতে পারে—যা ট্রাম্প ‘বড় জয়’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন।
সূত্র : আল জাজিরা
-পতাকানিউজ

