ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো সাম্প্রতিক হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা সমন্বয় কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
তাদের দাবি, হামলার আগে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) অত্যন্ত নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করে, যা অভিযানের সময় ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অভিযান সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানান, কয়েক মাস ধরেই খামেনির অবস্থান, চলাফেরা এবং নিরাপত্তা রুটিন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ধাপে ধাপে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাস, বৈঠকের ধরন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নজরদারি আরও নির্ভুল হয়ে ওঠে এবং সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে উচ্চমাত্রার নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়।
এই পর্যবেক্ষণের মধ্যেই সিআইএ জানতে পারে, শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কমপ্লেক্সে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে স্বয়ং আয়াতুল্লাহ খামেনির উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা ছিল। এই তথ্য পাওয়ার পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের পূর্বনির্ধারিত হামলার সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথমদিকে রাতের অন্ধকারে হামলার পরিকল্পনা থাকলেও নতুন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর অভিযান সকালবেলায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাদের ধারণা ছিল, ওই সময় একাধিক শীর্ষ নেতা একই স্থানে উপস্থিত থাকবেন, ফলে হামলার কৌশলগত সাফল্যের সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়বে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সিআইএ ইসরায়েলকে খামেনির অবস্থান সম্পর্কে “অত্যন্ত নির্ভুল” তথ্য সরবরাহ করে। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে নিজেদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের তথ্য মিলিয়ে কয়েক মাস ধরে হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। লক্ষ্য ছিল—ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে একযোগে আঘাত করা।
যে কমপ্লেক্সটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, সেখানে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, সর্বোচ্চ নেতার অফিস এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর অবস্থিত। গোয়েন্দা বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়, সেখানে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর প্রধান কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, সামরিক পরিষদের প্রধান অ্যাডমিরাল আলী শামখানি, আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ইউনিটের কমান্ডার সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভি, উপগোয়েন্দামন্ত্রী মোহাম্মদ শিরাজিসহ আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকবেন।
ইসরায়েলি সময় ভোর ছয়টার দিকে অভিযান শুরু হয়। সীমিতসংখ্যক যুদ্ধবিমান ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করলেও সেগুলোতে ছিল দীর্ঘপাল্লার উচ্চনির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, যা দূর থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। উড্ডয়নের প্রায় দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর তেহরান সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তু কমপ্লেক্সে আঘাত হানে।
হামলার সময় জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা একটি ভবনে অবস্থান করছিলেন বলে জানা যায়। খামেনি ছিলেন পাশের আরেকটি ভবনে। এক ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বার্তায় জানান, তেহরানের একাধিক স্থানে সমন্বিত হামলা চালানো হয়, যার মধ্যে অন্যতম ছিল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের কেন্দ্রস্থল।

ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, ইরান যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও এই অভিযানের মাধ্যমে ইসরায়েল “কৌশলগত চমক” দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস কিংবা সিআইএ আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
পরদিন ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা নিশ্চিত করে, হামলায় রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী শামখানি ও মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন। এর আগে ইসরায়েল তাদের হত্যার দাবি জানিয়েছিল।
অভিযানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি, গোয়েন্দা সমন্বয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির সমন্বয়ে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত অপারেশন। গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের নেতৃত্ব কাঠামো সম্পর্কে আরও গভীর তথ্য সংগ্রহে মনোযোগ দেয়। সেই সময় খামেনি ও আইআরজিসির যোগাযোগ পদ্ধতি, চলাচলের ধরণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার নানা দিক বিশ্লেষণ করা হয়।
সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এর আগে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাকে ঘিরে পরিকল্পনার সময় যে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছিল, সাম্প্রতিক এই অভিযানে একই নেটওয়ার্ক আরও উন্নত তথ্য সরবরাহ করেছে। পরবর্তী সময়ে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে খামেনির গতিবিধি আরও নিবিড়ভাবে অনুসরণ করা সম্ভব হয়।
এ ছাড়া ইরানের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অবস্থান সম্পর্কেও নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে। প্রধান কমপ্লেক্সে হামলার পর দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন গোয়েন্দা স্থাপনাকেও লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়। যদিও ইরানের শীর্ষ এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানা গেছে, তবু দেশটির গোয়েন্দা কাঠামোর জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের বড় অংশ এই অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা শুধু সামরিক অভিযান নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে গোয়েন্দা যুদ্ধের নতুন মাত্রা তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সম্ভাব্য সংঘাতের সতর্ক সংকেত থাকা সত্ত্বেও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যথেষ্ট কঠোরতা বজায় রাখতে পারেনি।
সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস
-পতাকানিউজ

