বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনীতির তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পরেই অবস্থান করছে চীন। ১৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি এবং সমরশক্তিতে ক্রমবর্ধমান আধুনিকীকরণ চীনের বিশ্ব নেতৃত্বের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের সামরিক ও অর্থনৈতিক সূচকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অগ্রাধিকার নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
চীনের সামরিক আধুনিকায়ন প্রকল্প মূলত ১৯৯৬ সালের তাইওয়ান প্রণালি সংকটের পর শুরু হয়েছিল। তখন চীনের সোভিয়েত আমলের পুরনো অস্ত্রশস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের সামরিক শক্তির কাছে কার্যত নীরবভাবে পরাজিত হয়েছিল। সেখান থেকেই বেইজিং বুঝেছিল, সামরিক প্রযুক্তি ও আধুনিকায়নে বিনিয়োগ ছাড়া তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়। ১৯৮৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত চীনের সামরিক বাহিনী ব্যাপক সংস্কারের মধ্য দিয়ে আধুনিকীকরণ লাভ করে। প্রতিবছর প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্তি ও আধুনিক অস্ত্র ক্রয় সেই পরিবর্তনের অংশ ছিল।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে চীনের বিজয় কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করেছে দেশের সামরিক আধুনিকায়নের সর্বশেষ অর্জন। সেখানে প্রদর্শিত হয়েছে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ওয়াইজে–১৭ ও ওয়াইজে–১৯, ডংফেং-৬১ ও ডংফেং-৫সি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক লেজার অস্ত্র এলওয়াই–১, রোবটিক যন্ত্র, ড্রোন বহর এবং এআই সমর্থিত সাবমেরিন। বিশেষ করে ‘গুয়াম কিলার’ নামের ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরের ঘাঁটিতে সরাসরি হুমকি হিসেবে ধরা হচ্ছে।
চীনের স্থলবাহিনীর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য। ৬ হাজার ৮০০টি ট্যাংক, ১ লাখ ৪৪ হাজার সাঁজোয়াযান, ৪ হাজার ৪৯০ কামান ও ২ হাজার ৭৫০ রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা দেশটির শক্তি প্রদর্শন করে। নৌবাহিনীতে চীনের ৩টি বিমানবাহী রণতরি, চারটি হেলিকপ্টারবাহী রণতরি, ৫০টি ডেস্ট্রয়ার, ৪৭টি ফ্রিগেট, ৭২টি করভেট ও ৬১টি সাবমেরিন রয়েছে। বিমানবাহিনীতে যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার তুলনায় পিছিয়ে, তবে জে-২০ ও জে-৩৬ পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে আঞ্চলিক এডভান্টেজ দখল করছে।
পরমাণু অস্ত্রের ক্ষেত্রে চীনের গতিশীলতা লক্ষ্যণীয়। ২০২৪ সালের শেষে ৫০০টি পরমাণু অস্ত্র থেকে চলতি বছরের শুরুতে সংখ্যা বেড়ে ৬০০-এ দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অস্ত্রের তুলনায় কম হলেও বৃদ্ধির ধারা উদ্বেগজনক।
চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কেবল সামরিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেশটি সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বিশ্বের ৬০ শতাংশ বিরল খনিজের দখল এবং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে চীন সেমিকন্ডাক্টরে আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকেও চীন দক্ষ। ব্রিকস, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) এবং বিশাল বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের মাধ্যমে দেশটি নিজের প্রভাব বিস্তার করছে। এই কৌশলগত কৌশল চীনের বিশ্ব নেতৃত্বের প্রস্তাবিত পথকে আরও সুসংগঠিত করছে।
অস্ত্র রপ্তানিতেও চীন ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে মনোযোগ দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকায় চীনা অস্ত্রের উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জে-১০ যুদ্ধবিমানের আন্তর্জাতিক চাহিদা, পাকিস্তানের সাবমেরিন ক্রয় চুক্তি, এবং বিদেশি বিনিয়োগ এসব প্রমাণ করে যে, অস্ত্র কেবল সামরিক শক্তি নয়, চীনের জন্য কূটনৈতিক হাতিয়ারও।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০৪৯ সালের মধ্যে চীনের লক্ষ্য—একটি আধুনিক সমাজতান্ত্রিক, শক্তিশালী ও সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বনেতার ভূমিকায় উঠে আসা—সম্ভবপর। সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে চীন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের সমান্তরালে নিজস্ব প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে। বিজয় কুচকাওয়াজ ও চলমান আধুনিকায়ন প্রমাণ করে, দেশটি শুধু অস্ত্রশস্ত্র নয়, বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতারও জন্য প্রস্তুত।
পতাকানিউজ/এনটি

