দুই সপ্তাহের নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত এমন এক সংকটের দুয়ারে পৌঁছেছে, যেখানে কূটনীতি ও সামরিক প্রস্তুতি-দুই পথই সমান গতিতে এগোচ্ছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ঘিরে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক উদ্বেগ।
যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হচ্চে মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই। সেই সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে বিশ্ব আবারও একটি বড় সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। মূল প্রশ্ন একটাই-এই সংঘাত কি আলোচনার টেবিলে থামবে, নাকি আবার শুরু হবে বোমাবর্ষণ?
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য বৈঠককে কেন্দ্র করে চলছে তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতা। তবে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে তেহরানের সিদ্ধান্ত নিয়ে। ইসলামাবাদ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানে না, ইরান আলোচনায় অংশ নেবে কি না।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, ইসলামাবাদ এখনো কূটনীতি ও সংলাপের পথেই এগোচ্ছে, তবে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হয়ে আসায় ইরানের সিদ্ধান্ত এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তারা তেহরান থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত পেয়েছেন এবং আশা করছেন যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ইরান আলোচনায় অংশ নেবে। একই সঙ্গে দুই দেশের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখেছে ইসলামাবাদ, কারণ এই বৈঠক ব্যর্থ হলে সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অবস্থান ক্রমেই কঠোর হয়ে উঠছে। নিজের স্যোশাল মাধ্যমে তিনি ক্ষণে ক্ষণে বার্তা দিয়েই যাচ্ছেন। রণভঙ্গ দিচ্ছেন না স্যোশাল মিডিয়ায়। তিনি কিছুক্ষণ মার্কিন গণমাধ্যমকে দুষছেন, কিছুক্ষণ ইরানকে হুমকি দিচ্ছেন। কখনো বলছেন, চুক্তির খুব আছে আছেন। আবার ইরান যোগ দেবে না জেনে হুমকি দিচ্ছেন পাল্টা আক্রমণের। সবমিলিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থান আগের চেয়ে বেশ ধোঁয়াশাময় হয়ে উঠেছে। তিনি জোর করে ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চান। কিন্তু ইরান যেন ‘বাগে’ আসছে না। তাই মরিয়া হয়ে হুমকি ধমকি দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলছেন, চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়াতে চান না তিনি। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে খুব বেশি সময় নেই। তিনি বলেছেন, একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারলে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে পারবে, কিন্তু আলোচনায় না বসলে তাদের সামনে কঠিন পরিণতি অপেক্ষা করছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে যুদ্ধের প্রস্তুতির বিষয়টি। তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির সময়টিকে মার্কিন বাহিনী প্রস্তুতির সময় হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম ইতোমধ্যে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নির্দেশ পেলেই অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত সেনাবাহিনী—এমন বার্তাই দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন অভিযানের জন্য ‘মুখিয়ে’ আছে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন হুমকিকে পাত্তা দিচ্ছে না ইরান। তেহরান ইতোমধ্যেই কঠোর বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়েছেন, হুমকির মুখে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, ট্রাম্প আলোচনার টেবিলকে আত্মসমর্পণের টেবিলে পরিণত করতে চাইছেন। যুদ্ধ আবার শুরু হলে ইরান ‘নতুন কার্ড’ দেখাতে প্রস্তুত বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস প্রকাশ করে বলেছেন, ওয়াশিংটনের বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী সংকেত রয়েছে এবং আলোচনার নামে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে। তাঁর ভাষায়, ইরানিরা কোনো শক্তির কাছে মাথা নত করে না। তবে এই কঠোর অবস্থানের মাঝেই ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে-যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংঘাতের মধ্যেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ওমান উপসাগরের একটি ঘটনা ঘিরে। মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ ‘তুসকা’ জব্দ করেছে। ইরান এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন ও অপরাধমূলক কাজ হিসেবে উল্লেখ করে জাহাজ ও ক্রুদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছে এবং সতর্ক করেছে যে প্রয়োজনে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তেহরান বলেছে, এই ঘটনার ফলে পরিস্থিতির যেকোনো অবনতির দায় পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। যুদ্ধবিরতির মাঝেই এই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে এবং সম্ভাব্য আলোচনার পরিবেশকে জটিল করেছে।
সম্ভাব্য বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে থাকতে পারেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনার।
অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে পারেন পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফ। ইসলামাবাদে ইতোমধ্যে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গণপরিবহন বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বৈঠকের সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে শহরটি এখন সম্ভাব্য এক ঐতিহাসিক বৈঠকের অপেক্ষায়।

এই সংকটের মধ্যে ইউরোপীয় শক্তিগুলোও সক্রিয় হয়েছে। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানকে জনগণের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসলামাবাদ যেতে প্রস্তুত-এখন তেহরানের উচিত গঠনমূলক আলোচনায় বসা। এই আহ্বান আন্তর্জাতিক চাপেরই প্রতিফলন, কারণ এই সংঘাতের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
অবশ্য, সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার খবর বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানি তেলের দাম কমেছে এবং এশিয়ার শেয়ারবাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৯৪ ডলারে নেমেছে, আর ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম নেমেছে ৮৮ দশমিক ৫০ ডলারে। এর আগে আলোচনার অনিশ্চয়তায় তেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। নতুন আলোচনার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারত, আর সেই আশঙ্কা সাময়িকভাবে কমেছে।
তবে যুদ্ধের মানবিক মূল্যও সামনে আসছে। পেন্টাগনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে ৪১৫ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে, যা যুদ্ধের বাস্তব চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
আবার, ইরান অভিযানের কভারেজ নিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে চালানো সামরিক অভিযান ছিল সম্পূর্ণ সফল, কিন্তু সংবাদমাধ্যম তা যথাযথভাবে তুলে ধরছে না। তাঁর মতে, এই ধরনের প্রতিবেদন শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করছে এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রতি অবমাননাকর।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ট্রাম্পকে জনসমক্ষে কঠোর ভাষা ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়েছে। পাকিস্তানের মতে, উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করতে পারে। ইসলামাবাদ চাইছে-যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগেই দুই দেশকে আলোচনার টেবিলে বসাতে।

এই সংঘাতের মূল ইস্যু এখনো অপরিবর্তিত-ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করুক, কিন্তু তেহরান সেই শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ট্রাম্পের অবস্থান স্পষ্ট-ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। এই ইস্যুতেই আগের দীর্ঘ আলোচনা ভেস্তে গিয়েছিল।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন তিনটি সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে-ইসলামাবাদে সফল বৈঠক ও নতুন চুক্তি, আলোচনা ব্যর্থ হয়ে নতুন সামরিক অভিযান, অথবা সীমিত সংঘাতের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ইসলামাবাদের দিকে। যুদ্ধবিরতির শেষ ঘণ্টাগুলো দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। কূটনীতি কি যুদ্ধ থামাতে পারবে-নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবার জ্বলবে-এই প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে খুব শিগগিরই।
সূত্র : আল জাজিরা ও দ্যা গার্ডিয়ান
-পতাকানিউজ

