ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকায় রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাই ও বেতন ব্যয় কমাতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। দেশটির রেল, গাড়ি, ধাতু, কয়লা, হীরা এবং সিমেন্ট শিল্পে ছাঁটাই বা কর্মদিবস হ্রাসের মতো পদক্ষেপ শুরু হয়েছে।
বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাত ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস, রপ্তানি কমে যাওয়া ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে শিল্পখাতগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে পড়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খনি ও পরিবহন খাতের অন্তত ছয়টি বড় কোম্পানি কর্মীদের বেতন ব্যয় কমাতে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে।
রাশিয়ার সর্ববৃহৎ সিমেন্ট উৎপাদনকারী কোম্পানি ‘সেমরস’ বছরের শেষ পর্যন্ত চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। কোম্পানির মুখপাত্র সের্গেই কোশকিন জানান, ‘এটি একটি প্রয়োজনীয় সংকট মোকাবিলা পদক্ষেপ। আমাদের লক্ষ্য সব কর্মীকে ধরে রাখা।’ কোম্পানির মোট কর্মী সংখ্যা ১৩ হাজার, এবং তাদের ১৮টি কারখানা রয়েছে।
তিনি জানান, চীন, ইরান ও বেলারুশ থেকে সিমেন্ট আমদানি বেড়েছে, আর নতুন নির্মাণ প্রকল্প কমে যাওয়ায় দেশীয় চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালে রাশিয়ায় সিমেন্ট ব্যবহারের পরিমাণ ৬ কোটি টনের নিচে নেমে আসবে বলে কোম্পানির পূর্বাভাস, যা শেষবার দেখা গিয়েছিল কোভিড মহামারির সময়।
রাশিয়ান রেলওয়ে, যার কর্মী সংখ্যা ৭ লাখ, অফিস কর্মীদের প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৩ দিনের বেতনবিহীন ছুটি নিতে বলেছে। প্রতিষ্ঠানটির আয় কমে গেছে কয়লা, ধাতু ও তেলের রপ্তানি হ্রাসের কারণে।
গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গর্কি অটোমোবাইল প্লান্ট এবং ট্রাক নির্মাতা কামাজ আগস্টে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করে। রাশিয়ার বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা আভতোভাজ, যেখানে প্রায় ৪০ হাজার কর্মী আছে, সেপ্টেম্বরে একই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে।
আলরোসা, বিশ্বের বৃহত্তম কাঁচা হীরা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, খনির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন কর্মীদের ১০ শতাংশ কমিয়েছে এবং অল্প লাভজনক কয়েকটি খনি সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
রাশিয়ার কয়লা খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপ-প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক জানিয়েছেন, প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে প্রায় ১৫ হাজার কর্মী কাজ করতেন।
সাইবেরিয়ার বৃহত্তম কয়লা অঞ্চল কুজবাস-এ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৮টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তা ও গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ১৯ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।
কুজবাসের এক খনি শ্রমিক রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি এখন পদোন্নতি পেয়েছি, কিন্তু আগের চেয়ে কম বেতন পাচ্ছি। পুরো এলাকায় বেতন কমে গেছে। সবাই বলছে, এটা সংকটের সময়—কয়লার আর চাহিদা নেই।’
বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদনকারী রাশিয়ার ধাতু শিল্পেও সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারের ফিনান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কমিশন আগস্টে জানিয়েছে, এই খাতে দেউলিয়া ঘোষণার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এক শিল্প সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ‘ধাতু শিল্পে এখন নিঃশব্দে কর্মী কমানোর প্রক্রিয়া চলছে। উচ্চ সুদের হার, রুবলের মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্বল চাহিদা- সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াই করছে।’
রাশিয়ার সামরিক-বহির্ভূত খাত চলতি বছর ৫.৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। দেশটির সেন্টার ফর ম্যাক্রোইকনমিক অ্যানালাইসিস অ্যান্ড শর্ট-টার্ম ফরকাস্টিং জানিয়েছে, চলতি বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৭ থেকে ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
২০২২ সালে রাশিয়ার অর্থনীতি ১.৪ শতাংশ সংকুচিত হলেও ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যথাক্রমে ৪.১ ও ৪.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। কিন্তু ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে মাত্র ১ শতাংশে।
বর্তমানে বেকারত্বের হার ইতিহাসের সর্বনিম্ন মাত্র ২.১ শতাংশ। তবে উচ্চ সুদের হার, রুবলের অতিমূল্যায়ন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং সস্তা চীনা পণ্যের আমদানি শিল্প খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে রাশিয়া সরকার বিভিন্ন শিল্পে ভর্তুকি, কর ছাড় এবং রেল পরিবহন খরচে ছাড় দিচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অস্থায়ী সহায়তা পরিস্থিতি সামলাতে যথেষ্ট নয়।
রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারকেই সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে- কিন্তু তাতেও কর্মীদের চাকরি ও আয় সুরক্ষিত থাকছে না।
পতাকানিউজ/এনটি

