মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–ইসরায়েল সংঘাত তীব্র হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও। কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।
একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা বাড়িয়েছে সরকার। গ্যাস সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে, বন্ধ রাখা হয়েছে কয়েকটি সার কারখানা। পাশাপাশি তেল ও এলপিজি সরবরাহে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশে গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে মার্চ মাসের জন্য স্পট মার্কেট থেকে দুটি এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করা হয়েছে। এর একটি সরবরাহ করবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান গানভর। এই কার্গোর দাম পড়ছে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ২৮ দশমিক ২৮ ডলার। এটি ১৫ থেকে ১৬ মার্চের মধ্যে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
আরেকটি কার্গো সরবরাহ করবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ট্রেডিং কোম্পানি ভিটল। এই কার্গোর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩ দশমিক ৮ ডলার। এটি ১৮ থেকে ২০ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই দাম চলতি বছরের শুরুর তুলনায় অনেক বেশি। জানুয়ারিতে বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে প্রায় ১০ ডলার দরে এলএনজি কিনতে পেরেছিল। তখন ফরাসি জ্বালানি কোম্পানি টোটালএনার্জিস। থেকে একটি কার্গো প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ দশমিক ৩৭ ডলার দরে কেনা হয়েছিল। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পসকো ইন্টারন্যাশনাল থেকেও প্রায় একই দামে আরেকটি কার্গো সংগ্রহ করা হয়েছিল। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এলএনজির দাম প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি খাতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি এনার্জি ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ বন্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে কাতার থেকে নির্ধারিত দুটি এলএনজি কার্গো বাংলাদেশে আসছে না। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় গ্যাস সরবরাহে কিছুটা রেশনিং শুরু করা হয়েছে। দিনে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য জরুরি খাতে গ্যাস সরবরাহ অগ্রাধিকার দিতে চারটি সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সরবরাহ ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সরকার আগাম সতর্কতা হিসেবে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সবাইকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে জ্বালানি বিভাগ বলছে, দেশে এখনই বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হয়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আগাম সতর্কতা হিসেবে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সরকার আগাম সতর্কতা হিসেবে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সবাইকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি তেলের বাজারেও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। সংকটের আশঙ্কায় গত কয়েক দিনে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের বিক্রি বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, গত চার দিনে প্রায় ৯৮ হাজার টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। গত বছর একই সময়ে ডিজেল বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৫৫ হাজার টন।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি। পাশাপাশি কয়েকটি ডিজেলবাহী জাহাজ আগামী সপ্তাহে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ফলে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রেও বিক্রি বেড়েছে। গত চার দিনে প্রায় ৯ হাজার ৩৮০ টন পেট্রল বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। অকটেন বিক্রি হয়েছে প্রায় ৮ হাজার টন। তবে পেট্রল ও অকটেনের মজুত নিয়ে আপাতত বড় কোনো উদ্বেগ নেই, কারণ এর একটি অংশ দেশেও উৎপাদিত হয়।
রান্নার জ্বালানি এলপিজির বাজারেও কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এর আগে গত বছরের শেষ দিকে এলপিজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। তখন ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় এক হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল। পরবর্তীতে সরকার বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বাড়তি এলপিজি আমদানির অনুমতি দিলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
বর্তমানে বাজারে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৪১ টাকার চেয়ে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলপিজি আমদানিতে জাহাজভাড়া বেড়ে গেছে, ফলে খরচও বাড়ছে।
বেসরকারি খাতের এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটি কোম্পানির প্রায় ১০ হাজার টন এলপিজি যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আটকে গেছে। এর মধ্যেও সবচেয়ে বেশি এলপিজি আমদানি করছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাষ্ট্রিজের ফ্রেশ ব্র্যান্ডের এলপিজি কোম্পানি। চলতি মাসে তারা প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি করছে বলে জানা গেছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, বেসরকারি খাতে যে এলপিজি মজুত রয়েছে, তাতে মার্চ মাসে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে এপ্রিল থেকে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। সে কারণে ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও চীনের মতো বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আমদানির চেষ্টা চলছে।
বেসরকারি খাতে যে এলপিজি মজুত রয়েছে, তাতে মার্চ মাসে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে এপ্রিল থেকে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। সে কারণে ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও চীনের মতো বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আমদানির চেষ্টা চলছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এপ্রিলের জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। যাতে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে এলপিজি আমদানি অব্যাহত থাকে এবং বাজারে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি না দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে আরও বেশি দামে এলএনজি কিনতে হতে পারে। এতে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে একদিকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে সাশ্রয়ী ব্যবহারের দিকেও জোর দিতে হবে।
-পতাকানিউজ

