মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলা হয় একজন ডিলমেকার, যিনি ব্যর্থতার জায়গাতেও সমঝোতার পথ খুঁজে নিতে পারেন। তবে বাস্তব জগতে যুদ্ধ ও ভূরাজনীতির জটিলতা দেখিয়েছে, এই দক্ষতারও সীমা আছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির যে চুক্তি তিনি সফলভাবে করাতে পেরেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি।
এ দুটি ঘটনার তুলনা করলে দেখা যায়, ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্য মূলত নির্ভর করে কোথায় তাঁর প্রভাব কতটা গভীর এবং সেই প্রভাব প্রয়োগে তাঁর রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটুকু তার উপর।
ট্রাম্পের গাজায় সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলের ওপর বিপুল প্রভাব। ইসরায়েল শুধু আমেরিকার মিত্র নয়, তার অস্তিত্বও অনেকটা ওয়াশিংটনের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

দীর্ঘ দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ‘Qualitative Military Edge’ বা সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে অস্ত্র, গোয়েন্দা সহায়তা ও জাতিসংঘে কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে আসছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তুষ্টি মানেই ইসরায়েলের জন্য বড় সংকেত। ট্রাম্প এই নির্ভরশীলতাকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করেছেন।
তাছাড়া গাজা যুদ্ধের পরিস্থিতিও কূটনৈতিক উদ্যোগের জন্য অনুকূল ছিল। ইসরায়েলের দীর্ঘ সামরিক অভিযান হামাসকে অনেক দুর্বল করে ফেলে। টিকে থাকার জন্যই তাদের আলোচনার টেবিলে বসতে হত। একপক্ষ যখন অস্তিত্ব রক্ষার চাপে, তখনই আলোচনার দরজা খোলে— যা ইউক্রেন যুদ্ধে অনুপস্থিত।
তবে গাজায় ট্রাম্পের সাফল্যের মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক ইচ্ছার পরিবর্তন। শুরুতে তিনি নীতিগতভাবে ইসরায়েলকে চাপ দিতে চাননি। কিন্তু যখন ইসরায়েলি বাহিনী কাতারে হামাস নেতাদের উপর হামলা চালায় তখন ট্রাম্প হঠাৎই সক্রিয় হয়ে ওঠেন। কেননা কাতার এখানে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থের কেন্দ্র। এখানে মানবিক সংকট নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ট্রাম্পের চাপও হয়ে ওঠে কঠোর। ফলাফল—যুদ্ধবিরতি চুক্তি।
অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। ২০১৪ সালের ক্রিমিয়া আক্রমণ এবং পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে সংঘাতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়, যা ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের মাধ্যমে তীব্র আকার ধারণ করে। এখানে ট্রাম্পের প্রভাব কার্যত শূন্য। রাশিয়া সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে প্রচলিত চাপ প্রয়োগের কৌশল কার্যকর হয়নি।
মস্কোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তেমন ফল দেয়নি, কারণ রাশিয়া তার বাণিজ্য চীন ও ভারতের দিকে সরিয়ে নিয়েছে। যুদ্ধও এখন স্থবির অবস্থায়—কেউ কারও ওপর পূর্ণ প্রাধান্য অর্জন করতে পারছে না। ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা সীমিত, ফলে আলোচনার বাস্তব প্রেরণা খুবই কম।

কূটনৈতিক দিক থেকেও ট্রাম্পের ব্যর্থতা স্পষ্ট। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি রাশিয়ার ওপর কঠোর চাপ দিতে পারেননি। বরং তার নীতি ছিল অনিশ্চিত ও দ্ব্যর্থবোধক।
তিনি বারবার রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা বা রুশ তেল কিনছে এমন দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের হুমকি দিলেও, বেশিরভাগই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে মার্কিন হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়।
এছাড়া ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সামরিক সহায়তা অনেক সময় স্থগিত রাখা হয় বা শর্তসাপেক্ষে দেওয়া হয়। এতে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত হয়, অন্যদিকে রাশিয়ার ক্ষতি কমে আসে।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ওয়াশিংটন যদি চায়, ইউক্রেনকে আরও উন্নত অস্ত্র দিয়ে মস্কোর যুদ্ধের খরচ অনেক বাড়ানো সম্ভব ছিল। কিন্তু তা হয়নি। তাই ইউক্রেনে ট্রাম্পের ব্যর্থতা মূলত ধারাবাহিক ও দৃঢ় কূটনৈতিক চাপে ঘাটতির ফল।
গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধের তুলনামূলক বিশ্লেষণে করলে দেখা যায়, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নীতিগত আদর্শ নয়, বরং ‘লেনদেনভিত্তিক বাস্তববাদ’।
গাজায় সাফল্য এসেছে কারণ সেখানে পরিস্থিতি ছিল অনুকূল: একপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, এবং যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও কৌশলগত স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়েছিল। ফলে ট্রাম্প সেখানে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করেন।
কিন্তু ইউক্রেনে পরিস্থিতি ছিল উল্টো। যুদ্ধের এক পক্ষ পরাশক্তি রাশিয়া এবং সমানে ইউক্রেনকে আমেরিকা-ইউরোপের সহায়তায় টিকিয়ে রাখার চেষ্টাও চলছে। আর সবথেকে বড় কথা, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি এমন কোন স্বার্থ না থাকা, যার ফলে তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে। ফলে ট্রাম্পের চাপ কেবল বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

সবমিলিয়ে ট্রাম্পের কূটনৈতিক মডেলের সারকথা হল, তিনি কেবল তখনই সক্রিয় হন, যখন তা যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বা কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। গাজায় তার সাফল্য যতটা না মানবিক উদ্যোগের অংশ, তারচে বেশি ছিল বাস্তববাদী লেনদেনের সুক্ষ্ম হিসেবনিকেশ।
অন্যদিকে, ইউক্রেন তার ব্যর্থতার প্রতীক—যেখানে তিনি একই প্রভাব বা দৃঢ়তা দেখাতে পারেননি।এ দুটি ক্ষেত্র মিলে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এখন নীতিনিষ্ঠ কূটনীতি নয়, বরং হিসেবি ক্ষমতার খেলা, যেখানে স্বার্থই চূড়ান্ত নিয়ামক।
লেখক: চেয়ারম্যান ইনচার্জ, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।
ই-মেইল: [email protected]

