ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে জাতীয় পার্টির (জাপা) নজিরবিহীন ভরাডুবি। সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ প্রতিষ্ঠিত দলটি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর এই প্রথম কোনো আসনে জয় পেতে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, এবারের নির্বাচনে দলটির কোনো প্রার্থীই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেননি। এমনকি দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুর অঞ্চলও দলটির জন্য নিরাপদ থাকেনি।
রংপুর, নীলফামারী অঞ্চল জাতীয় পার্টির ঘাটি তো থাকেইনি, অধিকন্তু সেখানে জামায়াত এবং এনসিপির উত্থানও হয়েছে। ওই অঞ্চলের সব আসনই দখলে নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রংপুর এবং নীলফামারীর ৯টি আসনের একটিও বিএনপি পায়নি। আওয়ামী লীগ বিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই অঞ্চলের প্রায় সব আসনই এককভাবে জামায়াত জোট দখল করে। অর্থ্যাৎ, জাতীয় পার্টির যেখানে পতনের শুরু, ঠিক সেখানেই যেন উত্থান হলো জামায়াত জোটের।
রংপুর জাতীয় পার্টির ঘাটি, এই খ্যাতির ভাঙন ধরিয়ে সেখানে জামায়াত জোটের উত্থানের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থান এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতির সঙ্গে আপসকামী ভূমিকার ফলেই দলটি নিজের স্বকীয়তা হারিয়েছে। তাঁদের মতে, এবারের নির্বাচন জাতীয় পার্টির জন্য শুধু একটি নির্বাচনী পরাজয় নয়; বরং এটি দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ নেতৃত্বের পরাজয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি মোট ২০০ আসনে প্রার্থী দেয়। কিন্তু ফলাফলে দেখা যায়, দলটির শীর্ষ নেতৃত্বই বড় ধাক্কা খেয়েছে। রংপুর–৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনে দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের তৃতীয় অবস্থানে থাকেন।
বেসরকারি ফল অনুযায়ী, ওই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল পেয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট এবং বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট। সেখানে জি এম কাদেরের প্রাপ্ত ভোট ৪৩ হাজার ৩৮৫, যা দলটির রংপুর ঘাঁটিতে অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা–১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আরও কম ভোট পেয়েছেন। তিনি প্রায় ৩৪ হাজার ভোট পান। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর মো. মাজেদুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২৬ ভোট এবং বিএনপির খন্দকার জিয়াউল ইসলাম মোহাম্মদ আলী পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৯৯৭ ভোট।
বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর পর সবচেয়ে বেশি প্রার্থী মাঠে নামিয়েও জাতীয় পার্টি কোনো আসনে জয় পায়নি—যা দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক: আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮৬ সালের পর থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক জাতীয় পার্টির জন্য দ্বিমুখী পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে ক্ষমতার অংশীদার হয়ে সংসদে বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান নিলেও অন্যদিকে দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ক্ষয় হয়েছে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিতর্কিত নির্বাচন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ বহুবার উঠেছে জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে। ফলে জনগণের একটি অংশ দলটিকে ক্ষমতাসীন দলের ‘সহযোগী’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায় জাতীয় পার্টি তাদের ভোটব্যাংক থেকে সমর্থন পাবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন নেতানির্ভর রাজনীতির কারণে তৃণমূল সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ অন্যান্য দলে চলে গেছে। এবারের ফলাফল সেই সংগঠনগত দুর্বলতাকেই প্রকাশ করেছে।
আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনেও সুবিধা হয়নি
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অধিকাংশ শরিক ভোটে অংশ নেয়নি। জাতীয় পার্টি বড় দল হিসেবে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী দেয়। তবে দলটির কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা নির্বাচনের আগেই দল ছেড়ে আলাদা সংগঠন গঠন করেন।

আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, রুহুল আমিন হাওলাদার ও কাজী ফিরোজ রশিদের মতো নেতারা আলাদা দল ঘোষণা করলেও প্রতীক সংক্রান্ত জটিলতায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। এতে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক শক্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দলটির কাকরাইলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক দফা হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন চাপ তৈরি করে। আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবিও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তুলেছিল, যা দলটির ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে।
অতীতের শক্ত অবস্থান থেকে বর্তমান পতন
সামরিক শাসক থেকে রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠা এইচ এম এরশাদ প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি একসময় জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলটি ৩৫টি আসন জিতে জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। তখন এরশাদ জেলে থাকা অবস্থায় রংপুরে পাঁচটি আসনে জয়ী হন এবং দলটির ভোট ছিল প্রায় ১২ শতাংশ।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩২টি আসন পায় এবং আওয়ামী লীগের সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর ২০০১ সালে আসন সংখ্যা কমে ১৪-তে নেমে আসে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে থেকে নির্বাচন করে দলটি ২৮টি আসন পায়।
২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় জাতীয় পার্টি ৩৪ আসন পেয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা নেয়। ২০১৮ সালে বিতর্কিত নির্বাচনে ২২টি আসন পেলেও ভোটের হার কমে যায়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলটির আসন নেমে আসে ১১-তে। এবারের নির্বাচনে শূন্য আসন পাওয়া সেই পতনের ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভাঙন, নেতৃত্ব সংকট ও সংগঠনগত দুর্বলতা
জাতীয় পার্টির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙন ও নেতৃত্ব সংকট ছিল। এরশাদ জীবিত থাকাকালেও দল কয়েকবার বিভক্ত হলেও তাঁর নেতৃত্বে মূল ধারা টিকে ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নিয়ে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে।
বর্তমানে জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন অংশই মূল জাতীয় পার্টি হিসেবে পরিচিত হলেও রওশন এরশাদের অনুসারীরা আলাদা ধারা বজায় রেখেছেন। দলের সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার বহিষ্কার ও পরে ফিরে আসা, বিভিন্ন নেতার দলত্যাগ—সব মিলিয়ে সাংগঠনিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে।
এ ছাড়া অতীতে মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি (জেপি) এবং নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) গঠনের মতো বিভাজন দলটির শক্তি কমিয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিজেপির প্রধান আন্দালিভ রহমান পার্থ বিএনপি জোটের হয়ে জয়ী হওয়াও জাতীয় পার্টির জন্য প্রতীকী ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উত্তরবঙ্গেও ধস
রাজনৈতিকভাবে ধারণা ছিল, রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় এরশাদের স্মৃতি ও লাঙ্গল প্রতীকের কারণে জাতীয় পার্টি কিছুটা হলেও শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারবে। রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দলটির প্রতি ভোটারদের সহানুভূতি ছিল।
কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই সমীকরণও ভেঙে যায়। উত্তরবঙ্গেও দলটির প্রার্থীরা পিছিয়ে পড়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই এটিকে জাতীয় পার্টির দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকটের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
-পতাকানিউজ

