উনিশশো একাশি সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয় তখন খালেদা জিয়া ছিলেন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে তখন ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তখন বিপর্যস্ত এবং দিশেহারা।
জিয়াউর রহমান পরবর্তী দলের হাল কে ধরবেন সেটি নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে। বিএনপি নেতারা তখন দ্বিধাগ্রস্ত এবং তাদের মধ্যে কোন্দলও ছিল প্রবল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ভাইস-প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন।
কিন্তু ৭৮ বছর বয়সী আবদুস সাত্তার দলে তেমন জনপ্রিয় ছিলেন না, যিনি শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠা করা দলের হাল ধরতে পারেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সাত্তারকে নিয়ে দুটো মত ছিল, যাদের একপক্ষ মনে করতে আবদুস সাত্তার সেনা সমর্থনের কারণে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পেয়েছেন, তাই তাকে দলের দায়িত্ব দেয়া যায় না। তখনই বিকল্প নেতা হিসেবে খালেদা জিয়ার নাম আলোচনায় আনেন কেউ কেউ।
বিএনপি’র ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৮২ সালের তেসরা জানুয়ারি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খালেদা জিয়া আত্মপ্রকাশ করেন। সেদিন তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন। একই বছর ৭ই নভেম্বর জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে খালেদা জিয়া প্রথম বক্তব্য রাখেন।
‘বিএনপি: সময়-অসময়’ বইয়ে লেখক মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন ‘বিএনপিতে যোগ দেবার পর থেকে খালেদা জিয়া বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া শুরু করেন। ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার এবং প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের সাথে খালেদা জিয়াও উপস্থিত ছিলেন।’
উনিশশো বিরাশি সালের ২১ জানুয়ারি বিএনপি’র চেয়ারম্যান নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। দলের মধ্যে তখন এনিয়ে বিভক্তি। দলের তরুণ অংশ চেয়েছিল খালেদা জিয়া দলীয় প্রধান হোক। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে বিএনপি’র প্রধান হিসেবে দেখেতে আগ্রহী ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ। বিএনপির চেয়ারম্যান হবার জন্য একইসাথে প্রার্থী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া এবং রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার।
বিএনপির ওয়েবসাইটে তখনকার ঘটনা বর্ণনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘এর ফলে এক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিচারপতি সাত্তার দুবার বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় যান। বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে তরুণ নেতৃত্বের মনোভাবে কথা জানান। এসময় বিচারপতি সাত্তার বেগম খালেদা জিয়াকে দলের সহ-সভাপতির পদ এবং দেশের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। কিন্তু বেগম জিয়া ব্যক্তিগত কারণে তা গ্রহণ করেননি। অবশেষে বিচারপতি সাত্তারের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর বেগম খালেদা জিয়া চেয়ারম্যান পদ থেকে তাঁর প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন।’
উনিশশো বিরাশি সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তখন রাজনীতিতে আবদুস সাত্তারের আর কোন মূল্য থাকেনি। তাঁর বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং নিষ্ক্রিয়তার কারণে দল থেকে তিনি আড়ালে পড়ে যান।
মি. সাত্তার আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান থাকলেও দল পরিচালনায় খালেদা জিয়ার প্রভাব বাড়তে থাকে। উনিশশো তিরাশি সালের মার্চ মাসে খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হন এবং এপ্রিল মাসের প্রথমে বিএনপির এক বর্ধিত সভায় তিনি ভাষণ দেন।
কিন্তু তৎকালীন বিএনপির কিছু নেতা সেটি পছন্দ করেননি। বিএনপির সেই অংশটি ভিন্ন আরেকটি জায়গায় বৈঠকের আয়োজন করে। সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের কয়েকমাস পরেই খালেদা জিয়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। এ সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠেন তিনি। এরপর ১৯৮৪ সালের ১০ মে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
মওদুদ আহমদ লিখেছেন, খালেদা জিয়া দলের চেয়ারম্যান হোন এটি সামরিক নেতারা, দুই গোয়েন্দা বিভাগ এবং মন্ত্রীসভার দুই গ্রুপ – কেউ চায়নি। প্রভুদের এবং নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজ অনেকটা জোর করেই বিচারপতি সাত্তারকে দিয়ে মনোনয়নপত্রে সই করান।
খালেদা জিয়া যদি তখন বিএনপির হাল না ধরতেন তাহলে বিএনপি নিঃসন্দেহে গভীর সংকটে পতিত হতো বলে মি. মাহফুজউল্লাহ মনে করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছিল তখন বিএনপির বাইরে অন্য রাজনৈতিক দল থেকে খালেদা জিয়াকে দলের নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এক্ষেত্রে হায়দার আকবর খান রনো এবং রাশেদ খান মেনন ছিলেন অন্যতম। খালেদা জিয়ার সাথে আলোচনার জন্য তারা দুইজন তাঁর তৎকালীন ক্যান্টনমেন্টের বাসায় গিয়েছিলেন।
মি. রনো তাঁর আত্মজীবনী ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইতে একথা তুলে ধরেছেন। খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে মি. রনো তাঁর বইতে লিখেছেন, ‘আমরা খালেদা জিয়ার কাছে প্রস্তাব করলাম, আপনি রাজনীতিতে আসুন, বিএনপির হাল ধরুন, এক্ষেত্রে এরশাদের বিরুদ্ধে লড়ব। এরশাদ সম্পর্কে তার ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু সরাসরি রাজনীতি করবেন কী-না সে সম্পর্কে কিছু বললেন না। দেখলাম, তিনি স্বল্পভাষী, তবে আমাদের কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। কোন কথা ঠিক মতো বুঝতে না পারলে, প্রশ্ন করে ভালো করে বুঝে নিচ্ছিলেন। সবশেষে তিনি বললেন, ভেবে দেখব।’
সূত্র : বিবিসি বাংলা
পতাকানিউজ/কেএস

