বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতি ১,০০০ জন জনসংখ্যার জন্য একজন চিকিৎসক থাকা উচিত। বাংলাদেশের ২০২২ সালের গৃহগণনা ও জনশুমারি অনুযায়ী, শহরের ৩৯৩ জন মানুষের জন্য একজন চিকিৎসক, আর গ্রামের দুই হাজার ৮৮৯ জনের ভাগে একজন চিকিৎসক রয়েছে।
অথচ মৌলভীবাজার জেলার প্রায় ২১ লাখ মানুষের জন্য চিকিৎসক আছেন মাত্র ১০জন। তার মানে, এ জেলায় প্রতি ২ লাখ ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র একজন। আর এতে যে জেলার চিকিৎসাব্যবস্থার কী হাল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানকার বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি চিকিৎসাসেবা পাওয়া যেন সোনার হরিণ পাওয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গছে, জেলার ৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কমপক্ষে মোট ১০০ চিকিৎসা কর্মকর্তা (মেডিকেল অফিসার) থাকার কথা। অথচ আছেন মাত্র ১০ জন। এর মধ্যে ৫টিই চলছে মাত্র একজন করে চিকিৎসক দিয়ে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে বিভিন্ন সময়ে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩১ শয্যার জনবলও নেই। চিকিৎসক-সংকটের কারণে জরুরি বিভাগ চালু রাখাও দুরূহ হয়ে পড়েছে। শ্রীমঙ্গল ও বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়া বাকিগুলোয় প্রসূতি অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা এখন বন্ধ।

সরেজমিনে কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৪০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। অথচ চিকিৎসকসংকটে কুলাউড়া, রাজনগর, জুড়ী ও কমলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গাইনি ও শিশু বিভাগে সেবা বন্ধ রয়েছে। বেশিরভাগ রোগীকেই ছুটতে হয় জেলা শহরের হাসপাতালগুলোয়। বিশেষ করে বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া থেকে রোগীদের ৫০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে জেলা শহরে যেতে হয়।
এ ছাড়া অধিকাংশ হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি, ওটি (অপারেশন থিয়েটার), ডেন্টাল চেয়ার, অ্যানেসথেসিয়া মেশিন ও অ্যাম্বুলেন্স অচল পড়ে আছে। কোথাও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সচল থাকলেও টেকনোলজিস্টের অভাবে সেবা বন্ধ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এক্স-রে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম করলে আধা ঘন্টার মধ্যে রিপোর্ট পাওয়া যায়। সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম আদৌ হয় না। জেলা সদর হাসপাতালে এক্স-রে করা হলেও সহজে রিপোর্ট পাওয়ার ব্যবস্থা নেই। ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালের সর্বত্র নোংরা পরিবেশ।
স্বাস্থ্য বিভাগের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী , জেলায় মেডিকেল অফিসার বা চিকিৎসা কর্মকর্তা থাকার কথা ১৪ জন; আছেন মাত্র ৫ জন; ৯টি পদই শূন্য। সহকারী সার্জন ৭ জনের ৬ জনই নেই। আবাসিক মেডিকেল অফিসারের ৫টি পদের ৪টিই শূন্য। জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদে ৩৯ জনের মধ্যে ফাঁকা ১৮টি। স্বাস্থ্য পরিদর্শক থাকার কথা ২০ জন, আছেন ৬ জন। মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ৪১টি পদের ১৮টিই খালি। সিনিয়র স্টাফ নার্সের ১৬২ পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৫৩টি।
এ ছাড়া উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার ২৬ জনের জায়গায় শূন্য রয়েছে ১৮টি পদ। সহকারী সার্জন থাকার কথা ৪২ জন, আছেন ৮ জন। উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার থাকার কথা ৬৫ জন, ফাঁকা রয়েছে ৩৬টি পদ। সব মিলিয়ে জেলায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ৩৯০টি পদ শূন্য।
বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা নিতে আসা রোগীরা বলেন, এসব হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া যায় না। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য এলেও জেলা শহরের হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বলা হয়।
কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী হনুফা বেগম, মিনাল সিংহা, আফিয়া, রহিম মিয়া, মালেকা বিবি, রাশেদ মিয়া পতাকানিউজকে প্রায় একই সুরে বলেন, হাসপাতালে এলে ডাক্তার কম থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হলে হাসপাতালে করানো সম্ভব হয় না। বেশি টাকা খরচ করে বেসরকারি সেন্টারে করাতে হয়। ওষুধও থাকে না সব সময়, বাইরে থেকে কিনে খেতে হয়। আমরা গরীব মানুষ কীভাবে এসব ওষুধ কিনে খাবো?

তাঁরা আরও বলেন, হাসপাতালটির ওয়ার্ডগুলোর বিছানার চাদর, বালিশ নোংরা। বাথরুগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। ভবনের পেছনের অংশে আর্বজনার স্তূপ। সারাক্ষণ মশা-মাছির উপদ্রব লেগেই আছে। তাছাড়া ভর্তি রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা খাবারও নিন্মমানের।
রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি সূত্র জানায়, ১০ চিকিৎসা কর্মকর্তার জায়গায় আছেন মাত্র দুজন। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদও শূন্য। এক্স-রে টেকনিশিয়ানের পদ অনেক দিন ধরেই ফাঁকা। তাই এক্স-রে হয় না। ল্যাব টেকনোলজিস্টের দুটি পদই শূন্য। হাসপাতালে কোনো ধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে সব ধরনের অস্ত্রোপচার।
কমলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে চিকিৎসক আছেন মাত্র একজন। দুজন চিকিৎসক প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন। জুনিয়র কনসালট্যান্ট এবং অ্যানেসথেসিস্ট পদসহ বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ খালি। বন্ধ রয়েছে প্রসূতি অস্ত্রোপচার। ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও ইসিজি মেশিনগুলোর টেকনিশিয়ান না থাকায় সেবা বন্ধ।
বড়লেখা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও চলছে মাত্র ৩ জন মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে। অথচ থাকার কথা ১৪ জন। যে ৩ জন আছেন, তাদের মধ্যে আবার দুই চিকিৎসক প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন। সিনিয়র স্টাফ নার্সের ২৫টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ১১ জন। জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও চলছে একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা দিয়ে। একজন চিকিৎসক সপ্তাহে একদিন আসেন। অথচ জনসংখ্যা অনুযায়ী এখানে প্রয়োজন ১৫ জন। সিনিয়র স্টাফ নার্সের ২৫টি পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ৭ জন। বন্ধ রয়েছে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অস্ত্রোপচার।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। এখানে ১০ চিকিৎসা কর্মকর্তার জায়গায় আছেন মাত্র একজন। এই একজন আবার প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে এখানে অস্ত্রোপচার বন্ধ। প্রায় দুই দশক ধরে এক্স-রে টেকনোলজিস্টের পদ শূন্য। হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে একটি চালু থাকলেও অন্যটি চালকের অভাবে পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন না হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সটি নষ্ট হয়ে গেছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ অন্যান্য পদে সংকট আরও প্রকট।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও চলছে মাত্র একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা দিয়ে। এই উপজেলার সবগুলো ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্রগুলোসহ মোট চিকিৎসক থাকার কথা ২৩ জন; আছেন মাত্র ১০ জন। অকেজো পড়ে আছে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি ও ইসিজি মেশিন।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো শয্যা নেই। তবে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতে দুজন চিকিৎসা কর্মকর্তা রয়েছেন।
সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন সংবাদকর্মী আলমগীর হোসেন। পরে অবশ্য তাঁকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে যেতে হয়। পতাকানিউজকে তিনি বলেন, সাংবাদিক হওয়ায় পেয়িং বেড়ে কিছুটা চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন তিনি। তবে সাধারণ রোগী এলে তেমন চিকিৎসা পায় না। জেলা সদর হাসপাতালের পরিবেশও নোংরা। এ হাসপাতালের চিকিৎসকরা আবার জেলা সদরের বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে সন্ধ্যার পর ফি নিয়ে রোগী দেখেন। এ কারণেই জেলা সদরের সব প্রাইভেট ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টারে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে কমলগঞ্জ, রাজনগর, জুড়ী, বড়লেখা ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের প্রায় একই ভাষ্য। পতাকানিউজকে তারা বলেন, কোনোভাবেই এত কম জনবল দিয়ে হাসপাতাল চালানো সম্ভব নয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জনবলসংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান বলেন, ‘আমরা বারবার আমাদের অধিদপ্তরকে বলে আসছি জনবলসংকটের কথা। দেশে সবচেয়ে বেশি চিকিৎসকসংকট মনে হয় সিলেট বিভাগে। আমাদের বলা হয়েছে, সিলেট বিভাগে অগ্রাধিকারভিত্তিতে চিকিৎসক নিয়োগ করা হবে। একইভাবে নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টেরও সংকট রয়েছে। সব বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো আছে। শুনেছি, নতুন করে চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হবে। এরপর হয়তো কিছুটা সংকট কাটবে।’
পতাকানিউজ

