বুধবার, ১ অক্টোবর রাতে বেশ কিছু সময় অঝোরে বৃষ্টি হয়। কয়েকঘণ্টা পর থেকেই শুরু হয় বিপত্তি। যানজটের শুরু। এক, দুই, তিন করে যানজট গিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে। চলতে থাকে মেরামত কাজ। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসে।
তবে শঙ্কা কাটেনি। আকাশে মেঘ থাকায় সেই শঙ্কা। মেরামত করা জায়গা ফের দেবে গিয়ে কিংবা কর্দমাক্ত হয়ে ঘটবে বিপত্তি- এমন শঙ্কা আবারও করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে একই সঙ্গে আশার বাণী শুনিয়েছেন, পুরোদমে নতুন সড়কের কাজ শুরু হলে এ সমস্যা থেকে উৎরানো যাবে।
বলা হচ্ছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে সরাইল পর্যন্ত অংশের কথা। এখানে যানজট এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। বিশেষ করে বৃষ্টি হলে যানজট যেন অবধারিত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে যাত্রীদেরকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

বিশ্বরোড খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ওসি মো. জাহাঙ্গীর আলম শুক্রবার, ৩ অক্টোবর বিকেলে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘বৃষ্টি হলে যানজট শুরু হতেও সময় লাগবে না। এটাই যেন নিয়তি হয়ে গেছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বুধবার রাতে বৃষ্টি হওয়ার পর ভোর থেকে যানজটের শুরু। এরপর মেরামত কাজ করা হয়। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর শুক্রবার ভোর চারটার পর থেকে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে থাকে। বিকেলে যান চলাচল একেবারেই স্বাভাবিক হয়।
সরাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মোশারফ হোসাইনের বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে সড়কে গর্ত আবার ভেসে উঠে। এতে গাড়ি আটকে ও গাড়ি ধীর গতিতে চলতে গিয়ে যানজট দেখা দেয়। এবার একাধিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বেশ মেরামত কাজ করা হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এ সড়কটির নির্মাণ কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয়েছে। কাজ শেষ হলে এখানে আর যানজটের সৃষ্টি হবে না।’

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অংশে বুধবার ভোরের যানজট আশুগঞ্জ গোলচত্বর থেকে সরাইল উপজেলার বেড়তলা, সরাইল বিশ্বরোড মোড় ও শাহবাজপুর সেতু হয়ে হবিগঞ্জের মাধবপুর এলাকা পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটারের বেশি অংশজুড়ে গিয়ে ঠেকে। মূলত বিশ্বরোড মোড়ে আগে থেকেই ভাঙা সড়কের গর্ত বৃষ্টির কারণে আগের অবস্থায় ফিরে গেলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
যানবাহন চালকরা জানান, ওই ভাঙা অংশ দিয়ে গাড়ি খুবই ধীর গতিতে চালাতে হয়। কখনো কখনো বড় গর্তে যানবাহন আটকে যায়। এতে যানজট বাড়তে থাকে। ছয় মাস আগে অর্থাৎ বৃষ্টির মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকেই এ অবস্থা চলছে। যানজট এ অংশটুকুর জন্য যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এদিকে ওই অংশটুকুর প্রভাব পড়ে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক ও সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই আঞ্চলিক মহাসড়কেও। বিকল্প পথ ব্যবহার করে ওই দুটি পথে চলতে গিয়ে সেখানেও যানজট দেখা দেয়। তবে বিজয়নগরের চান্দুরা হয়ে আখাউড়া দিয়ে আরেকটি বিকল্প পথ থাকলেও বেহাল দশার কারণে সেটি এখন ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বৃষ্টি ছাড়াও আরো একাধিক কারণে এখানে যানজট দেখা দেয়। এরমধ্যে ওই মোড়ে থাকা অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড থাকার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া মোড়ে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো, সড়কের পাশে অবৈধ দখলের বিষয়টি যানজটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।
আশুগঞ্জ-আখাউড়া চারলেন প্রকল্পের ব্যবস্থাপক শামীম আহমেদের বলেন, ‘এই প্রকল্পের যে সমস্যা ছিল, সেটা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমাধান হয়েছে। সড়কটির জন্য নতুন করে ১৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। আশা করি কাজ শুরুর পর ২ মাসের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে।’
এদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত অংশের চারলেনের কাজ দ্রুতই ফের শুরু করা হবে বলে গত ২২ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিদর্শনে এসে জানিয়ে গেছেন, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক।
মো. এহছানুল হক বলেন, ‘৫ আগস্টের পরে এখানে যারা ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মরত লোকজন ছিলেন, তারা নিজ দেশে চলে গেছেন। তারা নিরাপত্তার জন্য ভয় পেতেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে আশ্বস্ত করা হয়।
প্রকল্প ব্যবস্থাপকের বরাত দিয়ে এহছানুল হক বলেন, ‘উনারা দ্রুত ফিরে আসছেন। কাজে নামবেন। একটি জাহাজে মালামাল আসছে। আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এখানকার কাজ শেষ হবে বলে আমরা আশা করছি। এতে ভোগান্তি কমে আসবে।’
এখানে উল্লেখ্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ নৌ বন্দর থেকে সরাইল বিশ্বরোড হয়ে আখাউড়া পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার সড়কের প্রাথমিক কাজ শুরু হয় প্রায় ৮ বছর আগে। ৫ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজটি করছে ভারতের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এফকনস ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। ভারতীয় ঋণ ও দেশীয় অর্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট তৎকালীন ক্ষমতাচ্যুত সরকার দেশত্যাগের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনও চলে যান। কয়েকমাস পর তারা ফিরে এলেও নির্মাণ কাজের পণ্য চুরি হওয়ায় তারা ঠিকভাবে কাজ করতে পারছিলেন না। তবে জরুরি কিছু মেরামত কাজ তারা করেন।
আসছেন উপদেষ্টা
শনিবার, ৪ অক্টোবর থেকে হঠাৎ করে মহাসড়কটির ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশ্বরোড অংশে অস্থায়ী সংস্কার কাজ শুরু করা হয়। চলমান কাজের অংশ হিসেবে বিশ্বরোড গোল চত্বরে কয়েক স্তরে ইট ও বালু বিছানো হয়েছে। ৬০০ থেকে ৭০০ মিটার এলাকায় কাজ হবে বলে ধারণা পাওয়া যায়। এর মধ্যে গোলচত্বর অংশে ১২ মিটার প্রস্থ ও ১৮৫ মিটার দৈর্ঘ্য, আর গোলচত্বর থেকে সিলেটমুখী সরাইল কুট্টাপাড়া খেলার মাঠ পর্যন্ত ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ দশমিক ৩ মিটার প্রস্থে তিন স্তরে ইট ও বালু বিছানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত সড়ক ও পরিবহন উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বুধবার, ৮ অক্টোবর সড়কটি পরিদর্শনে আসবেন। যে কারণে বেশ তোড়েজোড়ে কাজ চলছে। এরই মধ্যে এ কাজের তদারকি করতে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন ও সরাইল এলাকায় একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে কাজ করাচ্ছেন।
এদিকে কাজের জন্য মূল মহাসড়কটি বর্তমানে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে মহাসড়কে চলাচলরত যানবাহনগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছে না। ফলে থেমে থেমে যানজট দেখা দেয়। বিশ্বরোড থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অভিমুখী পথে কিছু সময় যান চলাচল বন্ধ রাখলে যানজট আরো বেড়ে যায়।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক উপবিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) রোকন উদ্দিন খন্দকার বলেন, ‘বিশ্বরোড মোড়ের অংশটুকুর কাজ আমরা করছি। বাকি অংশটুকু সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ঠিক কত জায়গাজুড়ে কাজ হবে সেটা নির্ধারিত নয়। বেশি ভাঙা অংশ যেখানে আছে সেখান দিয়ে যেন যানবাহন ভালোভাবে চলতে পারে সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।
পতাকানিউজ/বিপিবি/এমওয়াই

