কারও হাতে ছোট ফুসকুড়ি, কারও শরীরে বড় ঘা, আবার কারও মাংস পচে হয়েছে কালো। গত দেড় মাসে আক্রান্ত প্রায় দুশতাধিক মানুষ। মারা গেছে কয়েক শত গবাদি পশু। খামার ঘরে পচা গন্ধ, রাস্তায় মরা গরু-ছাগল, আর হাসপাতালে ফুসকুড়ি ও ঘা আক্রান্ত মানুষের ভিড় দিন দিন বাড়ছে। রংপুরের পীরগাছায় নামহীন রহস্যজনক এ রোগে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপসর্গগুলো অ্যানথ্রাক্স রোগের সঙ্গে প্রায় মিল পাওয়া গেলেও সরকারিভাবে রোগ নির্ণয়ের কোনো উদ্যোগ নেই। শুরুতে ব্যবস্থা না নেয়ায় এখন ছড়িয়ে পড়েছে অজানা এ রোগ। আর কত মানুষ আক্রান্ত ও পশুর মৃত্যু হলে টনক নড়বে কর্তৃপক্ষের—এমন প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পীরগাছার সদর, ছাওলা, তাম্বুলপুর, পারুল ও ইটাকুমারী ইউনিয়নে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অজানা রোগটি। অসুস্থ গবাদি পশুদের মধ্যে প্রথমে তীব্র জ্বর, এরপরই মৃত্যু। আর সেই মৃত বা অসুস্থ পশুর সংস্পর্শ এবং মাংস খেয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। এতে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক ।
পীরগাছা উপজেলা সদরের অনন্তরাম বড়বাড়ি এলাকার বাসিন্দা সাবিনা আক্তার জানান, গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গরু ও ছাগল লালন-পালন করতেন তিনি। সপ্তাহ দেড়েক আগে হঠাৎ তীব্র জ্বরে অসুস্থ হয়ে মারা যায় সব পশু। অসুস্থ গবাদি পশুর সেবা করতে গিয়ে তিনিও আক্রান্ত অজানা এ রোগে।
তিনি বলেন, ‘সপ্তাহ দেড়েক আগে হঠাৎ করেই একে একে সব গরু তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়। স্থানীয় পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সুস্থ করে তুলতে সব ধরনের চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারিনি। তিনদিনের মধ্যে তিনটি গরু ও চারটি ছাগল মারা যায়। পরে দেখি আমার হাতে ফুসকুড়ির মত কি যেন উঠছে। দুদিন যেতেই সেই ফুসকুড়ি বড় ঘা আকারে পরিণত হয়। এখন প্রচণ্ড যন্ত্রণা করে এবং চুলকায়। স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা চলছে।’
সাবিনার মত পুরো পীরগাছায় এ অজানা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় দুশতাধিক মানুষ। যাদের সবাই অসুস্থ পশুর সংস্পর্শে ছিলেন বা অসুস্থ পশু জবাই করার পর মাংস স্পর্শ ও খেয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, গত দেড় মাস ধরেই অজানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। এমনকি অসুস্থ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা যাচ্ছে আক্রান্ত গবাদি পশু।
অজানা রোগে আক্রান্ত পঞ্চাশোর্ধ জাহেদা বেগম বলেন, ‘১০ থেকে ১২ দিন আগে হঠাৎ ডান হাতের একটি আঙ্গুলে চুলকানি শুরু হয়। পরে আস্তে আস্তে ফুসকড়ি থেকে ঘা। এখন ওই জায়গার মাংস পচে গিয়ে কালো হয়ে গেছে। ভিতরে প্রচন্ড জ্বালাপোড়া করে। নতুন করে আরও একটি আঙ্গুলে একইভাবে চুলকানি শুরু হয়েছে।’
ছাওলা ইউনিয়নের কৃষক আজিজুল হক বলেন, ‘পশু অসুস্থ হলে তার পরিচর্যা করতে হয়। বেশি অসুস্থ হলে অনেকে জবাই করে মাংস বিক্রি করেন। সেই মাংস কিনে খাওয়ায় অনেকে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। খাওয়ার দুই থেকে চার দিন পর শরীরে বড় বড় ঘা হচ্ছে।’
তাম্বুলপুর ইউনিয়নের জয়নাল মিয়ার ভাষ্য, তার চাচা গরু জবাই করে মাংস দিয়েছিলেন। মাংস ধুয়ে রান্না করা পর তার স্ত্রীর হাতে ঘা তৈরি হয়েছে। চাচার বাড়ির যারা মাংস নাড়াচাড়া করেছেন সবাই আক্রান্ত।
পীরগাছা সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, ‘মাস দেড়েক আগে একটি ছাগলের জ্বর আসে। অনেক চেষ্টার পরেও বাঁচার সম্ভাবনা না থাকায় ছাগলটি জবাই করি। ওই মাংস কাটাকাটি করার পরের দিন থেকে হাতে ছোট ছোট ফুসকুড়ি ওঠা শুরু হয়। পরে তা বড় ঘায়ে পরিণত হয়ে শেষ দিকে পচন ধরে। অনেক ওষুধ খাওয়ার পর এখন কিছুটা সুস্থ। স্থানীয় চিকিৎসক বলেছেন, এটা নাকি অ্যানথ্রাক্স রোগ।’
এদিকে পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন ৫–৭ জন আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। জানতে চাইলে হাসপাতালের উপ-সহকারী চিকিৎসক আখি সরকার বলেন, ‘একই পরিবারের সব সদস্য আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। পরীক্ষা না হলেও উপসর্গগুলো অ্যানথ্রাক্সের মতো। তবে এখনও কোনো ল্যাব টেস্ট হয়নি। ফলে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে—এটি অ্যানথ্রাক্স নাকি নতুন কোনো অজানা সংক্রমণ।’
আক্রান্ত পশু বাঁচাতে খামারিরা প্রাণী সম্পদ দপ্তরে ছুটলেও বেশিরভাগ সময় কর্মকর্তাদের পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ার ফলে একে একে মারা যাচ্ছে গবাদি পশু। অনেক খামারি বাধ্য হচ্ছেন অসুস্থ পশু জবাই করে কম দামে বাজারে বিক্রি করতে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি অজানা রোগও দ্রুত ছড়াচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি বেলাল হোসেন সতর্ক করে বলেন, ‘দিনের পর দিন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, পশু মরছে। অথচ কর্তৃপক্ষ চুপচাপ। দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে এটি মহামারীতে রূপ নিতে পারে।’
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রংপুর জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু ছাঈদ বলেন, ‘এটি জুনোটিক রোগ। শুরুতেই যদি স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক হতো তবে রোগ এতটা ছড়াত না। এখন আমাদের প্রধান কাজ হলো দ্রুত রোগ শনাক্ত করা।’
পতাকানিউজ/এসআই/আরবি

