রমজান মুসলমানদের জন্য আত্মসংযম, নৈতিক শুদ্ধি ও মানবিক সহমর্মিতার অনুশীলনের সময়। এই মাস মানুষকে ভোগ নয়, বরং সংযত জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, প্রতি বছর রমজান এলেই বাজার ব্যবস্থার এক ভিন্ন চিত্র সামনে আসে—যেখানে সংযমের জায়গা দখল করে নেয় অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম সংকট এবং অতি-মুনাফার প্রতিযোগিতা। এবারের খেজুরের বাজার সেই পুরোনো সমস্যাকেই আবারও স্পষ্টভাবে সামনে এনে দিয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশের চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার টন বেশি খেজুর আমদানি হয়েছে। আমদানির ওপর শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে, বন্দরে পণ্য খালাসেও বড় ধরনের জটিলতা ছিল না। অর্থাৎ সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার মতো বাস্তব কোনো কারণ ছিল না। তবু বাজারে খেজুরের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া প্রমাণ করে, সমস্যাটি আমদানিতে নয়; বরং বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অস্বচ্ছ কার্যক্রমের মধ্যে নিহিত।
আমদানিকারকদের একটি অংশ ডলারের দাম বৃদ্ধি, এলসি খোলার জটিলতা কিংবা আমদানি ব্যয় বাড়ার যুক্তি তুলে ধরছে। কিন্তু বাজারের বাস্তব চিত্র ও প্রাপ্ত পরিসংখ্যান সেই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কম মূল্য ঘোষণা করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে খেজুর আমদানি করা হয়েছে, পরে সেই পণ্যই কয়েকগুণ বেশি দামে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। মোকাম পর্যায়ে পাঁচ কেজির প্যাকেটেই ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা দেখায় যে দাম বাড়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হচ্ছে সরবরাহ শৃঙ্খলের মাঝামাঝি স্তর থেকেই। এর সরাসরি চাপ পড়ছে খুচরা বাজারে, যেখানে সাধারণ ক্রেতাকে আগের বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
খেজুর রমজানে কোনো বিলাসপণ্য নয়; ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে এটি ইফতারের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য প্রতিদিনের ইফতারে খেজুর রাখা এক ধরনের ঐতিহ্য ও প্রয়োজন—যা হঠাৎ করেই নাগালের বাইরে চলে গেলে সেটি কেবল বাজার সমস্যাই নয়, সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতীক হয়ে ওঠে। একজন ক্রেতার হতাশ কণ্ঠে বলা—‘ইফতারে খেজুর ছাড়া চলে না, কিন্তু এবার কিনতে পারছি না’—এই সংকটের মানবিক দিকটিই তুলে ধরে। বাজারের অস্থিরতা তখন আর সংখ্যার হিসাব থাকে না; তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কষ্টে পরিণত হয়।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বা খুচরা দোকানিকে জরিমানা করাকে কার্যকর সমাধান বলা যায় না। বরং প্রয়োজন পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্বচ্ছতার আওতায় আনতে আরো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আমদানির পর্যায় থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মূল্য নির্ধারণের তথ্য উন্মুক্ত করা জরুরি। কোন প্রতিষ্ঠান কত দামে এলসি খুলেছে, কী পরিমাণ শুল্ক পরিশোধ করেছে এবং কোন দামে বাজারজাত করছে—এই তথ্য জনসমক্ষে এলে অস্বাভাবিক মুনাফার সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে রমজানকেন্দ্রিক দ্রব্যমূল্য অস্থিরতার অন্যতম কারণ হলো বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাব ও সীমিত সংখ্যক আমদানিকারকের প্রভাব। ফলে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে এই চক্র ভাঙতে হলে বাজার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, আমদানি তথ্য ডিজিটালভাবে প্রকাশ করতে হবে এবং শুল্ক ফাঁকি বা কারসাজির বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, খেজুরের বাজার সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। কারণ রমজানের মতো সংবেদনশীল সময়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক আস্থার সংকটও তৈরি করে। সাধারণ মানুষ দেখতে চায়—নীতিনির্ধারণের ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।
রমজান সংযম ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। সেই মাসেই যদি বাজারে লুটপাটের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পায়, তবে তা কেবল অর্থনীতির ব্যর্থতা নয়, সামাজিক মূল্যবোধেরও অবক্ষয় নির্দেশ করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দায়িত্ব এখন সতর্কবার্তা দেওয়ার সীমা ছাড়িয়ে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া। বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক অতি-মুনাফা বন্ধ করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
কারণ সাধারণ মানুষের ইফতারের স্বস্তি কোনোভাবেই মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ীর অতিরিক্ত মুনাফার কাছে জিম্মি হতে পারে না। রমজানের প্রকৃত চেতনা রক্ষার অর্থই হলো—বাজারেও সংযম নিশ্চিত করা।
-পতাকানিউজ

