রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার সংরক্ষিত ঝিলের অর্ধেক জমি রামপুরা থানার স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর—এমন তথ্য প্রকাশের পর নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুযায়ী জায়গাটি একটি সংরক্ষিত জলাধার হিসেবে চিহ্নিত, যা রাজধানীর বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরাট ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গণপূর্তের এই সিদ্ধান্তকে ‘পরিবেশবিধি লঙ্ঘন ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝিল ভরাটের ফলে মালিবাগ-রামপুরা এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও তাপদূষণ আরও বেড়ে যাবে।
মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার মাটির মসজিদ-সংলগ্ন ও রামপুরার বউবাজারের মধ্যবর্তী স্থানে প্রায় ৩৯ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী চৌধুরীপাড়া ঝিল। এই ঝিলের দক্ষিণাংশে বর্তমানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে পরিষ্কার কার্যক্রম চলছে—যেখানে রামপুরা থানার স্থায়ী ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছে সিএসআই কনস্ট্রাকশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাদের কর্মীরা জানিয়েছেন, এখন নকশা অনুমোদনের অপেক্ষা চলছে; পেলে দ্রুত কাজ শুরু হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন থানার স্থায়ী ভবন নির্মাণের চলমান প্রকল্পের আওতায় রামপুরা থানার জন্য ঝিলের ৫০ শতাংশ জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, বরাদ্দকৃত জায়গাটি জলাশয়ের অংশ নয়; বরং এটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ছিল, যা অধিগ্রহণ করে গণপূর্ত থেকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, চৌধুরীপাড়া ঝিল ড্যাপে সংরক্ষিত জলাধার হিসেবে তালিকাভুক্ত—যা ভরাট করা আইনে নিষিদ্ধ। তাদের অভিযোগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই এ বরাদ্দ দিয়েছে। রাজউক ইতিমধ্যে গণপূর্তে চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার এ বিষয়ে মন্তব্য না করে বিষয়টি ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-৪-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কাছে পাঠান। কিন্তু তিনি ফোন ও বার্তা—কোনোটিরই জবাব দেননি।
‘সেইভ ফিউচার বাংলাদেশ’-এর প্রধান সমন্বয়ক ও জলবায়ু ন্যায়বিচারকর্মী নয়ন সরকার এ সিদ্ধান্তকে “রাষ্ট্রীয়ভাবে জলাধার হত্যার পদক্ষেপ” বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ড্যাপে সংরক্ষিত জলাধার ভরাট করা মানে শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়—এটি নগরবাসীর জীবনের ঝুঁকি বাড়ানো, ভূগর্ভস্থ পানির ঘাটতি এবং তাপদূষণ বাড়ানোর মতো অপরাধ।
তার মতে, সরকার চাইলে বিকল্প জমিতে থানা নির্মাণ করতে পারে, কিন্তু সংরক্ষিত জলাধার দখল করা কোনোভাবেই ন্যায্য নয়। এতে সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদসহ জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ লঙ্ঘিত হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক ফরিদ আহমেদ জানান, বিষয়টি তদন্তাধীন। তাদের পরিদর্শক সরেজমিন যাচাই করছেন জমি বরাদ্দের বিষয়টি। জমির রেকর্ড হাতে পেলেই তারা বিস্তারিত জানাতে পারবেন।
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তনের জন্য জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া রয়েছে, যা অনুসরণ না করলে বরাদ্দ বেআইনি হয়। ড্যাপে যদি এটি জলাধার হিসেবে উল্লেখ থাকে, তবে সেখানে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ও আইপিডির পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “এটি জনবিরোধী ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। গণপূর্ত কীভাবে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই সংরক্ষিত জলাধার ভরাটের উদ্যোগ নেয়, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।”
তিনি আরও বলেন, “আগের সরকারের সময় যেমন হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন জলাশয় ধ্বংস করা হয়েছে, এখনো সেই ধারাই চলছে। হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী জলাধার জীবন্ত সত্তা; তাই এটি ভরাট করা একটি ফৌজদারি অপরাধ।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের আওতায় ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে ফাঁড়ি, তদন্তকেন্দ্র, ক্যাম্প, নৌ-পুলিশকেন্দ্র, রেলওয়ে পুলিশ থানা ও আউটপোস্ট, ট্যুরিস্ট পুলিশ সেন্টার এবং হাইওয়ে পুলিশের জন্য স্থায়ী ভবন নির্মাণ’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে রামপুরা থানার ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
মোট প্রকল্প ব্যয় ৭৩০ কোটি ৫৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, মেয়াদ তিন বছর। গত ২৯ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
পরিবেশবিদদের মতে, জলাধার দখল বা ভরাট ঢাকার জলাবদ্ধতার মূল কারণগুলোর অন্যতম। যেখানে সরকার খাল ও জলাধার উদ্ধার অভিযান চালানোর কথা বলছে, সেখানে রাষ্ট্রীয় সংস্থার উদ্যোগে সংরক্ষিত জলাধার দখল নীতিগত বৈপরীত্য তৈরি করছে।
চৌধুরীপাড়া ঝিলের মতো জলাধার যদি একে একে বিলুপ্ত হয়, তবে রাজধানী ঢাকার বৃষ্টিপাত-পরবর্তী জলাবদ্ধতা ও তাপদূষণ আগামী বছরগুলোতে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
পতাকানিউজ/এনটি

