২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের ৪১ জেলায় ৪৩৮ স্থানে ছড়িয়ে থাকা আন্দোলন দমন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নজরে এসেছে। এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। ৩৬ বছরের পুলিশের কর্মজীবন ও নিজের মেয়াদকালে ঘটে যাওয়া মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের দায় এড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ট্রাইব্যুনালে তিনি রাজসাক্ষী বা ‘অ্যাপ্রুভার’ হিসেবে আদালতের সামনে নিজের জ্ঞানে থাকা সব সত্য প্রকাশ করেছেন।
মামলার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১০ জুলাই ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের প্যানেল হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী মামুনের বিচার শুরু করেন। মামুন আদালতে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছেন, তিনি দোষী এবং স্বেচ্ছায় সব তথ্য প্রকাশ করবেন। তার ভাষায়, ‘আমি দোষ স্বীকার করছি। আমি স্বেচ্ছায় সত্য প্রকাশ করব। এ মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত আমার জানা সব পরিস্থিতির কথা তুলে ধরব।’
সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি পুলিশ বাহিনীতে দুটি ভেতরের গ্রুপের গঠন, আন্দোলন দমন ও হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনার অন্তর্দৃষ্টি, গ্যাং অব ফোরের বৈঠক, মারণাস্ত্র ব্যবহারের বিবরণ, র্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন সেল ও গোপন বন্দিশালার তথ্যসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে ঘটে যাওয়া সিদ্ধান্তগুলোর বিস্তৃত তথ্য প্রকাশ করেছেন। মামুনের জবানবন্দি অনুসারে, ঢাকায় মাত্র ৯৫,৩১৩ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়, যা সহিংসতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এছাড়া, পুলিশের অধীনে থাকা অফিসাররা তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্দেশে অতি-উৎসাহী হয়ে ওঠে।
আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ জানান, ‘মামুন ট্রাইব্যুনালের সামনে সব সত্য প্রকাশ করেছে এবং শর্তসাপেক্ষে রাজসাক্ষী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই শর্ত পূরণ হলে আইন অনুযায়ী তাকে সর্বোচ্চ সুবিধা হিসেবে খালাসও দেওয়া যেতে পারে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক কোনো দেনদরবারের প্রশ্ন এখানে প্রযোজ্য নয়।
বিচারকাজ চলাকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, মামলার প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর গ্যাং অব ফোরের সদস্য ও পরিকল্পনার মূল হোতা ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তার উপরে সর্বোচ্চ সাজা চাওয়া হয়েছে। তবে চৌধুরী মামুন রাজসাক্ষী হিসেবে আদালতকে তথ্য দিয়েছেন, যা তার শাস্তি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাবেক এই পুলিশপ্রধানের দেওয়া জবানবন্দি ন্যায়বিচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করছে না, একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর মনোবল ও সামাজিক আস্থার পুনর্নির্মাণেও ভূমিকা রাখবে। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সঠিক সাজা নিশ্চিত করা হলে দেখা যাবে, কেউই আইন থেকে উচ্চ নয় এবং ভবিষ্যতে পুলিশ বা অন্য সরকারি ইউনিটের পদক্ষেপেও সংবেদনশীলতা ও সতর্কতা বজায় থাকবে।
প্রসঙ্গত, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে এলএমজি, এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল, শটগান ও রিভলভার অন্যতম। ৫০টিরও বেশি জেলায় এই হত্যাযজ্ঞে মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায় পুলিশের ওপর এসেছে।
সর্বশেষ, ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায় ১৩ নভেম্বরের মধ্যে ঘোষণা করা হতে পারে। আদালতের সিদ্ধান্ত চৌধুরী মামুনের জন্য খালাস নাকি সম্পূর্ণ সাজা নির্ধারণ করবে—এই প্রশ্ন এখন দেশের নজরের কেন্দ্রে। তবে এ জবানবন্দি আদালত ও তদন্তকারীদের কাছে সত্য উদঘাটনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পতাকানিউজ/এনটি

