বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে এটিই তার নিজেরও প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ। নির্বাচনের মাত্র মাসখানেক আগে মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শোকাহত অবস্থায় দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ এবং দেশের রাজনীতিতে সরাসরি প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
দলের সমর্থকেরা তাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তার অতীতের বিতর্ক, দুর্নীতির অভিযোগ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে বিএনপি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে।
দীর্ঘ প্রায় সতের বছর লন্ডনে অবস্থানের পর গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিতে তার নেতৃত্বে আসা অনেকটাই অনিবার্য ছিল, কিন্তু এবারই প্রথম তিনি একক নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষার মুখে পড়েছেন।
নেতৃত্বের পালাবদল ও নির্বাচনের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রাষ্ট্রপতির বড় ছেলে হিসেবে কিশোরকাল অতিক্রম করেন তারেক রহমান। বাবার মৃত্যুর পর ১৯৯১ সালে বিএনপি সংসদ নির্বাচনে জয় পায় এবং প্রধানমন্ত্রী হন প্রয়াত জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া। এরপর তারেক জিয়া প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হিসেবে পরিচিতি পান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করে। আর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্ব সরাসরি চলে এসেছে তাদের বড় ছেলে তারেক রহমানের হাতে।
প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনা করলেও আনুষ্ঠানিক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন চলতি বছরের জানুয়ারিতে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ১০ দিন পর অনুষ্ঠিত বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে।
এই নির্বাচনে বিএনপির দীর্ঘদিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। ফলে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে একসময়কার মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; বরং তারেক রহমানের নেতৃত্বের সক্ষমতা যাচাইয়ের বড় মঞ্চ।

দেশে ফেরা নিয়ে সংশয় ও প্রত্যাবর্তন
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হন তারেক রহমান। ১৮ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে তিনি সপরিবারে লন্ডনে চলে যান।
দীর্ঘ নির্বাসনের পর গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় ফেরেন। তবে দেশে ফেরা নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংশয় ছিল। মায়ের অসুস্থতার সময় ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছিলেন, যা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির মধ্যেই তিনি দেশে ফেরেন। এর মাধ্যমে প্রায় দুই দশক পর সরাসরি দেশের রাজনীতির মাঠে তার প্রত্যাবর্তন ঘটে।

বিদেশে থেকেও দলের নিয়ন্ত্রণ
২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই লন্ডনে অবস্থান করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের দায়িত্ব পালন করছিলেন তারেক রহমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলার প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, ওই সময় থেকেই বাস্তবে দলটি তার নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিদেশে থেকেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা তারেক রহমানের বড় সাফল্য। তার ভাষায়, “দেশের বাইরে থেকেও তিনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন। এখন দেশে ফিরে তার সিদ্ধান্তগুলো কেমন হয় সেটাই দেখার বিষয়।”
রাজনৈতিক উত্থান
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তারেক রহমান। যদিও নির্বাচনী হলফনামায় তার জন্মসাল ১৯৬৮ উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএএফ শাহীন কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন বলে দলীয় সূত্রে বলা হয়, তবে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন কি না তা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। নির্বাচনী হলফনামায় তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘উচ্চ মাধ্যমিক’ উল্লেখ করা হয়েছে।
আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। দলের নেতাদের মতে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় থেকেই তার সাংগঠনিক ভূমিকা বাড়তে শুরু করে। তবে প্রকৃত উত্থান ঘটে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর।
ওই সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর ‘হাওয়া ভবন’কে ঘিরে তারেক রহমান ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। সমালোচকদের মতে, সেটি সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। বিএনপি অবশ্য এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে।
বিতর্ক, মামলা ও রাজনৈতিক ধাক্কা
২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগ তারেক রহমানকে দায়ী করেছিল। পরে আওয়ামী লীগ আমলে মামলায় তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়। বিএনপি এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।
নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে মোট ৭৭টি মামলার তথ্য রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি এসব মামলা থেকে খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন।
২০০৭ সালে গ্রেফতারের সময় তাকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে আদালতে নেওয়া হয়েছিল, যা সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগও তুলেছিল বিএনপি।
পরবর্তীতে তিনি লন্ডনে যান এবং দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন। যদিও তার রাজনীতি ছাড়ার বিষয়ে নানা গুঞ্জন ছিল, পরে তিনি সক্রিয়ভাবে দল পরিচালনায় যুক্ত হন।
ভাবমূর্তি পুনর্গঠন ও নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
দেশে ফেরার পর বিএনপি তাকে কেন্দ্র করে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে তাকে মধ্যপন্থী জাতীয় নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরার কৌশল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
একই সঙ্গে দলের ভেতরের চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রায় ৫০টি আসনে দলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া তার নেতৃত্বের জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রতিকূল সময় পার করার পর এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তিনি কি দলীয় নেতা থেকে জাতীয় নেতা হয়ে উঠতে পারবেন?
সামনে কী?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই শুধু একটি সাধারণ নির্বাচন নয়; বরং এটি তারেক রহমানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যাত্রারও গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। রাষ্ট্রপতির কিশোর ছেলে থেকে প্রধানমন্ত্রী ছেলে হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ থেকে বিতর্ক, নির্বাসন, মামলা এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর এখন তিনি সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রে।
অতীতের বিতর্ক ও সমালোচনা ছাপিয়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা সফল হতে পারেন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশকে কোথায় নিয়ে যাবেন-সেটাই এখন দেখার বিষয়।
-পতাকানিউজ

