বিএনপি সরকার গঠনের দুই সপ্তাহ পার করেছে। তৃতীয় সপ্তাহের যাত্রা শুরু করা সরকার এখনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেনি। দলটির নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী এখনো রাষ্ট্রপতির মেয়াদ রয়েছে। তাই এখন রাষ্ট্রপতি পদের চেয়ে সংসদ অধিবেশনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদ স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার পদ পূরণের আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকারি দল বিএনপি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে এখনই উদ্যোগ না দিলেও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দাবি আছে। বিশেষ করে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার আমলের রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি চায় বিরোধী দল। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রপতির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। এতে বিরোধী দল ক্ষুব্ধ হয়েছে। সে বিষয়ে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বক্তব্য দিয়েছেন।
বিরোধী দল এখনই রাষ্ট্রপতি পদে নতুন মুখ চায়—এটা স্পষ্ট হলেও সরকারি দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ এখনো আছে, তাই এখনই রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে আলোচনা কেন? বিএনপির এমন অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে অবশ্য এরই মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কারণ, আওয়ামী লীগ আমলের রাষ্ট্রপতি নিয়ে বিএনপি কেন বেশ আগ্রহী এবং এর নেপথ্যে তৃতীয় দেশের ইন্ধন আছে কি না—এটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
অবশ্য বিএনপির ভেতরেই আলোচনা আছে, হাসিনা আমলের রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা উচিত। তবে সরকার হয়তো আগে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করে সংসদীয় কার্যক্রম শুরু করতে চাইছে। এরপর হয়তো নতুন সিদ্ধান্ত আসতেও পারে। কারণ, রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে তাড়াহুড়ো করার মতো অবস্থা নেই বলে বিএনপির কোনো কোনো নেতা মনে করছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও সংসদের সর্বোচ্চ পদে অভিজ্ঞ, গ্রহণযোগ্য এবং রাজনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বসাতে চায় দলটি। আলোচনায় আছেন জ্যেষ্ঠ নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও অভিজ্ঞ আইনজীবীরা। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় যারা
রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় থাকা এই নেতা অতীতে মন্ত্রিত্বও করেছেন। জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর নাম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামও আলোচনায় আছে। রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা কেন?’ তাঁর বক্তব্য, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হয়নি। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো বিএনপিতে তিন-চারজন আছেন।’
প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে কার্যত সরকারি দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। স্পিকার পদে একাধিক নাম স্পিকার পদ নিয়েও চলছে সমানতালে আলোচনা।

স্পিকার পদে আলোচিত নাম
আলোচিতদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুক, বর্তমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। হাফিজ উদ্দিন আহমদ ছয়বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সংসদ পরিচালনায় ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর নাম সামনে এসেছে। অন্যদিকে, ওসমান ফারুকও সংসদীয় কার্যপ্রণালি সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
জয়নুল আবেদীন প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও আইন পেশায় দীর্ঘ সম্পৃক্ততা এবং সংবিধান ও সংসদীয় বিধিবিধান বিষয়ে দক্ষতার কারণে আলোচনায় আছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, স্পিকার হওয়ার মতো যোগ্য নেতা বিএনপিতে একাধিক আছেন; তাঁদের মধ্যে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান ও জয়নুল আবেদীনের নাম উল্লেখ করেন তিনি।
ডেপুটি স্পিকার নিয়ে সমঝোতার ইঙ্গিত
আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসছে। সংবিধান অনুযায়ী অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত সোমবার সাংবাদিকদের জানান, জুলাই জাতীয় সনদের সমঝোতার প্রতি সম্মান জানিয়ে ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে একজনকে নেওয়া হবে। এ জন্য প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নাম প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে।
যদিও সংবিধানে সংসদ উপনেতা নির্বাচনের বিধান নেই বলে জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে অতীতে সংসদ উপনেতা রাখার নজির রয়েছে এবং দলের একটি অংশ এ পদ রাখার পক্ষে মত দিচ্ছে।
সাংবিধানিক বিধান ও প্রক্রিয়া
সংবিধান অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। পদ শূন্য হলে সাত দিনের মধ্যে অথবা সংসদ বৈঠকরত না থাকলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে তা পূরণ করতে হবে।
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে, নির্ধারিত সময়ের অন্তত এক ঘণ্টা আগে কোনো সদস্য অন্য সদস্যকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচনের জন্য লিখিত প্রস্তাব দিতে পারেন; প্রস্তাবটি তৃতীয় একজন সদস্যের সমর্থিত হতে হয়।
প্রস্তাবিত সদস্যকে দায়িত্ব নিতে সম্মত থাকার লিখিত বিবৃতি দিতে হয়। কেউ নিজের নাম প্রস্তাব বা সমর্থন করতে পারেন না। প্রয়োজন হলে বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় এবং একটি প্রস্তাব গৃহীত হলে বাকি প্রস্তাব আর ভোটে যায় না। একই পদ্ধতিতে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়।
নির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে রাষ্ট্রপতি শপথ পড়ান। সাধারণত জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে এ শপথ অনুষ্ঠিত হয়। নতুন স্পিকার শপথ নেওয়ার পর তাঁর সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচনও হতে পারে।
সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গন
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আপাতত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পথে না গিয়ে বিএনপি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনেই মনোযোগ দিচ্ছে। ইতিমধ্যে সংসদের চিফ হুইপ ও হুইপ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে। অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা ও রাজনৈতিক কৌশল—সব বিবেচনায় রাষ্ট্র ও সংসদের শীর্ষ দুটি পদে শেষ পর্যন্ত কারা বসছেন, তা জানতে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বাড়তি কৌতূহল। ১২ মার্চের অধিবেশন ঘিরে সেই কৌতূহল আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
-পতাকানিউজ

