নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি পদে কে আসছেন—এ প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। মঙ্গলবার সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এবং বিকেলে মন্ত্রিপরিষদের শপথ। এর পরপরই নতুন সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী পরিবর্তিত বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন আসবে কি না—তা নিয়েই এখন জোর জল্পনা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সম্ভাব্য কয়েকজনের নাম ঘুরছে। যদিও দলীয় একটি দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য, মন্ত্রিসভা কিংবা রাষ্ট্রপতি—যে পদ নিয়েই আলোচনা হোক না কেন, চূড়ান্ত তালিকা রয়েছে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে অন্য কারও তা জানার সুযোগ নেই। তবুও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা থেমে নেই।
ফখরুলের নাম সরলেও জোরালো মোশাররফ
শুরুর দিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর–এর নাম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় আসে। তবে দলীয় সূত্রগুলো এখন বলছে, তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি পদে নতুন করে সামনে এসেছে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নাম।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন–এর নাম জোরালোভাবে বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে আলোচনায় আছেন আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তবে রাজনৈতিক অন্দরে মোশাররফ হোসেনের নামই বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসন পেয়ে সরকার গঠনের পথে। মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদ নিয়েও সমান্তরাল আলোচনা চলছে।
বর্তমান রাষ্ট্রপতির অবস্থান
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুযায়ী তাঁর মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। তবে গত ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সরে যাওয়ার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন, নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা তাঁর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। একই সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতির প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলার ঘটনাকে ‘অপমানজনক’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নতুন সরকার গঠনের পর তিনি পদত্যাগ করতে পারেন—এমন আলোচনা এখন জোরালো।
মোশাররফের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
৭৯ বছর বয়সী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবার কুমিল্লা–১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৯১, ১৯৯৬ (দুই দফা) ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৯১ সালে জ্বালানিমন্ত্রী এবং ২০০১ সালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যে অবস্থান করে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন।
২০২৩ সালে বগুড়ায় বিএনপির এক সমাবেশে দলটির নেতা জি এম সিরাজ প্রকাশ্যে বলেছিলেন—বিএনপি সরকার গঠন করলে তারেক রহমান হবেন প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি হবেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। সেই বক্তব্য আবারও আলোচনায় এসেছে।
তবে দলীয় একটি সূত্র বলছে, মোশাররফ হোসেন সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় কর্মকাণ্ডে কিছুটা কম সক্রিয়। নিজেকে আড়ালে রাখেন, যাতে তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক না তৈরি হয়।
নজরুল ইসলাম খানের সম্ভাবনা
স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানও আলোচনায় থাকলেও দলীয় ভেতরে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করার পরামর্শ রয়েছে। সম্প্রতি খালেদা জিয়ার জানাজায় দলের পক্ষে বক্তব্য দেন তিনি। এবারের নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়কও ছিলেন।
চূড়ান্ত ঘোষণা কবে?
নতুন রাষ্ট্রপতির নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার নাম ঘোষণা হবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, সরকার গঠনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে যাবে।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি পদে কাকে বেছে নেওয়া হচ্ছে—তা শুধু সাংবিধানিক প্রয়োজন নয়, নতুন সরকারের রাজনৈতিক বার্তার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এখন নজর ঘোষণা ঘিরে।
-পতাকানিউজ

