জ্বালানি সংকট নিরসনে রোববার থেকেই সুখবর দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। বাড়ানো হতে পারে অকটেনের সরবরাহ। পাশাপাশি ডিজেলের ক্ষেত্রেও আসতে পারে সুখবর।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ফলে বিশ্বব্যাপী যে জ্বালানি সংকট শুরু হয়েছে, তার ধাক্কায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়েছেন। দীর্ঘ লাইন ধরেও পেট্রল পাম্প থেকে তেল পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। ফলে ভোগান্তির মাত্রা দিনদিন বাড়ছেই।
আর এমন পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তবে বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা থেকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের দুর্ভোগও কমছে না।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিপিসি আগামী রোববার থেকেই অন্তত ২৫ শতাংশ অকটেন সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে গ্রাহকদের দুর্ভোগ লাগব হবে বলে মনে করছে বিপিসি।
বিপিসির ভাষ্য অনুযায়ী, এই মুহূর্তে দেশে অকটেনের প্রকৃত ঘাটতি নেই; বরং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও চাহিদা বৃদ্ধির চাপ থেকেই সংকট তৈরি হয়েছে। অনেকেই মজুত করছেন জ্বালানি। ফলে সংকট ঘণীভূত হচ্ছে।
এই অবস্থায় বাজারে স্বস্তি ফেরাতে আগামী রোববার বা সোমবার থেকে অকটেন সরবরাহ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পাশাপাশি কৃষিখাতে চাহিদা বিবেচনায় ডিজেলের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে।
দীর্ঘ লাইনে ভোগান্তি, বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা
ঢাকা এবং চট্টগ্রামসহ দেশের অধিকাংশ পেট্রলপাম্পে প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি। অনেক ক্ষেত্রে পাম্পে তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় চালকদের ফিরেও যেতে হচ্ছে।
পাম্প মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে অকটেন সরবরাহ কমে যাওয়ায় লাইনের দৈর্ঘ্য বেড়েছে। যদিও বিপিসির তথ্য অনুযায়ী দেশে অকটেনের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, তবু বাজারে সরবরাহ কম থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত মজুত বা আগেভাগে তেল নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এর ফলে বাস্তবে ঘাটতি না থাকলেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং ভোগান্তি বাড়ে।

ব্যক্তিপর্যায়ে মজুত
নাম প্রকাশ হবে না শর্তে প্রাইভেটকারের মালিকদের একজন পতাকানিউজের সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন, তিনি বাসায় ১০০ লিটার অকটেন মজুত করেছেন। কারণ, দীর্ঘ লাইন ধরেও অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না। জরুরি প্রয়োজনে তিনি এই তেল ব্যবহার করবেন। এখন চালককে পাঠিয়ে দুই দিন পরপর লাইন ধরে তেল সংগ্রহ করছেন। এতে গাড়ি অফিসের কাজে ব্যবহারের চেয়ে পাম্পের সারিতেই থাকছে বেশিরভাগ সময়। চালক গাড়ি নিয়ে পাম্পে থাকলে এই ব্যবসায়ী অটোরিকশা নিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করছেন এবং স্কুল থেকে ছেলেকে আনা নেওয়া করেন। তেল মজুতের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তো বিক্রির জন্য মজুত করিনি। নিজের জরুরি প্রয়োজনের দিন বিপদ এড়াতে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়েছি।’
এমন একাধিক গাড়ি মালিকের সঙ্গে আলাপ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, অনেকেই ব্যক্তিপর্যায়ে তেল মজুত করেছেন যাতে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন। যদি বাজারে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হয়, তাহলে মজুত কমে আসবে এবং সংকটও ধীরে ধীরে কমে যাবে বলে বলছেন পাম্প মালিকরা।
পর্যাপ্ত মজুত, তবু কেন সংকট
জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অকটেনের মজুত ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ৮১৯ টন। ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত বিক্রির পর মজুত রয়েছে ৩০ হাজার ৬৬৭ টন, যা বর্তমান সরবরাহ হারে প্রায় ২৬ দিনের সমান।
এর মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরে আরও ২৫ হাজার টন অকটেনবাহী জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় উৎস থেকেও প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৭০০ টন অকটেন উৎপাদন যুক্ত হচ্ছে।
অর্থাৎ সরবরাহের তুলনায় মজুতের পরিমাণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরবরাহ না বাড়ালে সংরক্ষণের জায়গা সংকট দেখা দিতে পারে। এই বাস্তবতাই এখন বিপিসিকে সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে গিয়ে উল্টো সংকট
বিপিসি ও তেল বিপণন কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পেট্রলপাম্প থেকে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি চাহিদা আসছে। কিন্তু গত বছরের একই সময়ের বরাদ্দের ভিত্তিতেই সরবরাহ দেওয়া হচ্ছিল।
ফলে অনেক পাম্প প্রতিদিন তেল পাচ্ছিল না। জ্বালানি বিভাগ বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারি করছে এবং সরবরাহে ব্যত্যয় ঘটলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাড়তি চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কোথাও কোথাও সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের মার্চে প্রতিদিন গড়ে অকটেন সরবরাহ ছিল ১ হাজার ১৯৩ টন। চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে ১ হাজার ২১৯ টনে পৌঁছালেও এপ্রিল মাসে সরবরাহ কমে গেছে। ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে সরবরাহ হয়েছে ১ হাজার ১১৫ টন-যা গত মাসের তুলনায় ১০৪ টন কম।
সরবরাহ বাড়ানোর প্রস্তুতি
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, খুব দ্রুত বাজারে অতিরিক্ত অকটেন সরবরাহ শুরু হবে। প্রয়োজনে ডিজেলের ক্ষেত্রেও একই উদ্যোগ নেওয়া হবে, বিশেষ করে কৃষি মৌসুমের চাহিদা মাথায় রেখে।
সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় নতুন বরাদ্দ কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি পাম্পের বর্তমান বিক্রি, স্থানীয় চাহিদা ও ভিড় বিবেচনায় নিয়ে বরাদ্দ বাড়ানোর সুপারিশ করা হবে।
পেট্রলপাম্প মালিক নেজাম উদ্দিন বিপিসির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, পাম্পে সরবরাহ বাড়লে দীর্ঘ লাইন কমবে। তবে ডিলার, এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটরদের পুরো সরবরাহ চেইনে সমন্বয় না করলে সমস্যা পুরোপুরি কমবে না। পাম্পের দীর্ঘ সারি কমাতে হলে অন্যদের দিতে যাবে, যাতে ওই গ্রাহকেরা নির্দিষ্ট জায়গা থেকেই তেল পান।
অকটেনের ব্যবহার ও চাহিদা
মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশই অকটেন। মূলত মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসে এটি ব্যবহৃত হয়। গত অর্থবছরে দেশে মোট ৪ লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। এর অর্ধেক দেশেই উৎপাদিত হয়, বাকি অর্ধেক আমদানি করতে হয়।
চলতি এপ্রিল মাসে অকটেনের চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার টন।
দেশের চারটি বেসরকারি শোধনাগার নিয়মিত অকটেন উৎপাদন করছে। এগুলো হচ্ছে, চট্টগ্রামের সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড ও পারটেক্স পেট্রো লিমিটেড, নরসিংদীর অ্যাকোয়া রিফাইনারি লিমিটেড এবং বাগেরহাটের পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড।
এছাড়া গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট শোধন করেও অকটেন উৎপাদন হচ্ছে।

কিউআর কোড পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা
লাইন কমাতে ঢাকার সাতটি পাম্পে কিউআর কোডের মাধ্যমে তেল বিক্রির পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আপাতত ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল নিবন্ধন করা গেলেও কোম্পানির গাড়ি বা ব্যক্তিগত কার যুক্ত হয়নি। মাঝেমধ্যে কারিগরি সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।
বিপিসি জানিয়েছে, পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পের সমস্যাগুলো সমাধান করে মাস শেষে সারা দেশে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
জ্বালানিবিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় আগে সরবরাহ বাড়ানো হয়নি। এখন সরবরাহ বাড়ানো হলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে, তবে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে সময় লাগবে।
তাদের মতে, সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি পাম্প থেকে তেল সরবরাহের সীমা বাড়ানো, চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছ নজরদারি জরুরি।
সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি বাজারে এখন সংকটের চেয়ে বড় সমস্যা সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও চাহিদার চাপ। দ্রুত সরবরাহ বাড়ানো হলে অন্তত লাইনের চাপ কমবে এবং মানুষের আতঙ্ক কমবে-এমনটাই আশা করা হচ্ছে।
-পতাকানিউজ

