এক দশক আগে যে মাঠে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক, সেই মাঠেই এবার আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে ফিরলেন ক্রিস্টিয়ান ‘কুতি’ রোমেরো। শুধু অধিনায়কত্বই নয়, জন্মভূমি কর্দোবার মারিও কেম্পেস স্টেডিয়ামে গোলও করলেন এই সেন্টারব্যাক। আর ম্যাচ শুরুর আগে রোমেরোর চাচার করা ভবিষ্যদ্বাণীও মিলে গেল – রোমেরো গোল করলেন, তবে জয়টা হলো তাঁর অনুমানের চেয়েও বড় ব্যবধানে।
বলিভিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৪–০ গোলের জয়ের ম্যাচটি রোমেরোর জন্য তাই হয়ে উঠেছে বিশেষ এক দিন। ম্যাচ শেষে নিজেও বলেছেন, ‘আমার জন্য বিশেষ দিন।’
দিনটি রোমেরোর পরিবারের জন্যও ছিল আবেগের। কর্দোবায় বাংলাদেশ সময় আজ সকাল ছয়টায় শুরু হওয়া ম্যাচ ঘিরে স্থানীয় সময় বুধবার সকাল থেকেই রোমেরোর মা রোসা গঞ্জালেসের ফোনে একের পর এক শুভেচ্ছা আসতে থাকে। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ‘ক্ল্যারিনে’র কাছে রোসা মজা করে বললেন, ‘সবাই মিলে একসঙ্গে বসে যে একটু সকালের নাশতা করব, সেই সুযোগটাও পাইনি!’
অবশ্য এমন দিনে রোসার ফোন ব্যস্ত থাকাটাই স্বাভাবিক। ঘরের ছেলে যে ফিরেছেন আকাশি-সাদা জার্সিতে, তাও আবার অধিনায়ক হয়ে!
লিওনেল মেসি জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার পর নতুন অধিনায়ক হিসেবে রোমেরোর নাম ঘোষণা করেছিলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। সেই সিদ্ধান্তের পর কর্দোবায় জন্মভূমির মাঠে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে খেললেন রোমেরো। এর আগে তিনবার আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিলেও সেগুলো ছিল অনানুষ্ঠানিক দায়িত্ব।
রোমেরোর জন্য এই দায়িত্বের আরেকটি বিশেষ দিক আছে। অধিনায়কের আর্মব্যান্ডটি তিনি পেয়েছেন তর্কযোগ্যভাবে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার মেসির কাছ থেকে। যদিও এই আন্তর্জাতিক বিরতিতে আরও একটি ম্যাচ খেলে জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখবেন মেসি। এরপর নিয়মিত অধিনায়ক হিসেবে রোমেরোর দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হতে পারে।
রোমেরোর বিশেষ দিনে ‘আইসিং অন দ্য কেক’ ছিল তাঁর গোলটি। ৫৩ মিনিটে নিকো পাজের সেট পিস থেকে দারুণ হেডে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলটি করেন তিনি।
এই গোলের সঙ্গে যেন ফিরে আসে এক দশক আগের স্মৃতিও। ঠিক এই মারিও কেম্পেস স্টেডিয়ামেই কর্দোবার স্থানীয় ক্লাব বেলগ্রানোর হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল রোমেরোর।
সেই স্মৃতির কথা ম্যাচ শেষে নিজেই বলেছেন তিনি, ‘১০ বছর আগে বেলগ্রানোর হয়ে এখানে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম। জাতীয় দলের ইতিহাসে সেরা সময়ের সঙ্গীও হয়েছি। তারপর এখানে অধিনায়ক হিসেবে ফিরে আসা- সত্যিই দারুণ এক অনুভূতি। কখনো এটা কল্পনাও করিনি। এটা অনেক বড় একটা দায়িত্ব, তবে আমি প্রস্তুত।’
রোমেরোর আরেকটি বিশেষত্বও যেন সেদিন আরও একবার সামনে এল। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর পাঁচটি গোলই এসেছে হেডে। রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি সেট পিসে মাথা দিয়ে গোল করার দক্ষতার কারণেই সতীর্থ ও সমর্থকদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন একরকম ‘হেড মাস্টার’।
কর্দোবায় তাঁর জনপ্রিয়তার ছবিটাও ছিল চোখে পড়ার মতো। ম্যাচ দেখতে কেম্পেস স্টেডিয়ামে আমন্ত্রিত ১২ বছর বা তার কম বয়সী প্রায় আট হাজার শিশুর বড় একটি অংশের মুখে ছিল রোমেরোর নাম। কর্দোবার বিভিন্ন ক্লাব, ক্রীড়া ও সামাজিক সংগঠন থেকে আসা এসব শিশু গাসপারিনি গ্যালারির একটি বড় অংশজুড়ে বসেছিল।
সেই গ্যালারিতে ছিলেন রোমেরোর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনেরাও। বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন মিলিয়ে প্রায় ২০ জন কাছের মানুষ ম্যাচটি দেখতে এসেছিলেন।
স্টেডিয়ামে প্রবেশের সময় রোসা বলেছিলেন, ‘ছেলের জন্য ভীষণ গর্বিত। সে একাগ্রতা ও ত্যাগের অনন্য উদাহরণ; তার সাফল্যই আমার সাফল্য। আর তার অধিনায়কত্ব পাওয়ার আনন্দ পুরো পরিবারের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি।’
ম্যাচ শুরুর আগেই অবশ্য রোমেরোর চাচা আরও একটি ভবিষ্যদ্বাণী করে বসেছিলেন। তাঁর কথা ছিল, ‘সে আজ হেডে গোল করবে। আমরা জিতব ২–১ ব্যবধানে।’
প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী মিলে গেলেও দ্বিতীয়টি মেলেনি। রোমেরো সত্যিই হেডে গোল করেছেন, তবে আর্জেন্টিনা জিতেছে ৪–০ গোলে।
রোমেরোর দাদি অবশ্য ফলাফল কিংবা ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে ভাবিত নন। নাতির সাফল্যেই তাঁর আনন্দ। তিনি বলেন, ‘কুতির জন্য আমি সব সময় খুশি। আমার শুভকামনা সব সময়ই থাকে। এত অল্প সময়ে সে যা অর্জন করেছে, তা সত্যিই দারুণ। পুরো পরিবার তার জন্য ভীষণ গর্বিত।’

তবে এত আনন্দের মধ্যেও রোমেরোর মনে ছিল একজনের শূন্যতা। তিনি লিওনেল মেসি। মেসির বিদায় প্রসঙ্গে রোমেরো বলেছেন, ‘আমাদের অধিনায়ক লিওকে খুব মনে পড়বে। তাঁর মতো আর কেউ কখনো হবে না।’
-পতাকানিউজ

