মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে আবারও লাউয়াছড়া বনের ভেতর ইঞ্জিন বিকল হয়ে থেমে গেল আন্তনগর ট্রেন। একই জায়গা, একই সমস্যা, একই দুর্ভোগ—কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষের যেন কোনো হেলদোল নেই। পুরোনো ও দুর্বল ইঞ্জিন দিয়ে ঢাকা–সিলেট ও সিলেট–চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চালিয়ে যাত্রীদের বারবার বিপদে ফেলছে রেল কর্তৃপক্ষ। দায় এড়ানোর সুযোগহীন এমন কর্মের পর প্রশ্ন উঠেছে—এটা কি শুধুই অবহেলা, নাকি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল?
গত ৭ ফেব্রুয়ারি বেলা সোয়া ১টায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায় চট্টগ্রামগামী আন্তনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়। শমশেরনগর স্টেশন ছেড়ে কিছু দূর যেতেই পাহাড়ি টিলা অতিক্রমকালে পুরোনো ইঞ্জিন আর টান সামলাতে পারেনি। ফল—সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের ট্রেন চলাচল বন্ধ সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
এরপরও শিক্ষা নেয়নি রেল কর্তৃপক্ষ। গত ২০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত ভোরে আবারও একই এলাকায় বিকল হলো সিলেটগামী আন্তনগর উপবন এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন। রাত সাড়ে ৩টার দিকে ট্রেনটি লাউয়াছড়ার ভেতর ‘ঘুমিয়ে’ যায়। ঘুমন্ত ট্রেনের বগির পেটে প্রায় দুই ঘণ্টা অন্ধকার বনে আটকা পড়ে শত শত যাত্রী। পরে বিকল্প ইঞ্জিন এনে ‘ধাক্কা দিয়ে’ ট্রেনটিকে ভানুগাছ স্টেশনে নেওয়া হয়।
এমন ঘটনা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মে পরিণত হয়েছে। রেল সূত্রে জানা গেছে, সিলেট রুটে কয়েক বছর ধরে পুরোনো ও দুর্বল ইঞ্জিন দিয়ে আন্তনগর ট্রেন চালানো হচ্ছে। নতুন ইঞ্জিন রেলওয়েতে যুক্ত হলেও সেগুলো এই রুটে দেওয়া হয়নি। অথচ চট্টগ্রামের পর সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসে সিলেট বিভাগ থেকে। আয় যেখানে বেশি, সেবার মান সেখানে কেন এমন নিম্নগামী—এই প্রশ্নের উত্তর নেই।
শমশেরনগর স্টেশন মাস্টার রজত রায় স্বীকার করেছেন, দুর্বল ইঞ্জিনের কারণেই লাউয়াছড়ায় প্রায়ই ট্রেন আটকে পড়ে। পাহাড়ি সাতগাঁও ও কমলগঞ্জ এলাকার টিলা অতিক্রমের সময় পুরোনো ইঞ্জিন শক্তি হারায়। তাঁর মতে, নতুন ইঞ্জিন হলে এ সমস্যা থাকত না। ভানুগাছ স্টেশন মাস্টার এস এম গৌর প্রসাদও সাম্প্রতিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ছিল বনের ভেতর আটকে পড়া যাত্রীদের দুর্ভোগ। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে অনেক যাত্রী ট্রেন থেকে নেমে হেঁটে কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কে উঠেছেন। সেখান থেকে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে সিএনজি, প্রাইভেটকার বা বাসে গন্তব্যে যেতে হয়েছে। একদিকে নিরাপত্তাহীনতা, অন্যদিকে অতিরিক্ত খরচ—সবকিছুর বোঝা বইতে হয়েছে যাত্রীদেরই।
কমলগঞ্জের যাত্রী সুহেল আহমদ বলেন, ‘প্রায়ই সিলেট রুটে ট্রেন বিকল হয়। মাঝরাতে বনের মধ্যে আটকে পড়া কতটা ভয়ংকর, সেটা যারা ভোগে তারাই বোঝে।’ ব্যবসায়ী শাহ আলম জুয়েল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সিলেট থেকে রেলওয়ে প্রচুর রাজস্ব পায়। কিন্তু যাত্রীসেবায় তার প্রতিফলন নেই। একই অবহেলা বছরের পর বছর।’
গত বছর সিলেটে নতুন ট্রেন ও আসন বৃদ্ধিসহ ৮ দফা দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। কয়েক দফা রেলপথ অবরোধও হয়। তখন রেল কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দেয় আসন বৃদ্ধি ও উন্নয়নের। বাস্তবে যা হয়েছে তা হলো—আগে অতিরিক্ত বগি যুক্ত করে যে আসন দেওয়া হতো, সেটিকেই ‘বৃদ্ধি’ বলে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। সেই অতিরিক্ত বগির টিকিটের দামও বেশি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রেলকর্মী জানান, এটি ছিল জনচাপ সামাল দেওয়ার কৌশল, স্থায়ী সমাধান নয়।
প্রতি সপ্তাহে কোথাও না কোথাও ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রেন আটকে পড়ছে। আখাউড়া জংশন থেকে উদ্ধারকারী ইঞ্জিন এনে টেনে নেওয়া হচ্ছে বিকল ট্রেন। এতে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিলম্ব নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও রোগী—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কিন্তু দায় স্বীকার বা কাঠামোগত সমাধানের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
লাউয়াছড়ার ঘটনা দুটি স্পষ্ট করে দিয়েছে—সমস্যা জানা, কারণ জানা, সমাধানও জানা। তবু কার্যকর সিদ্ধান্ত নেই। দুর্বল ইঞ্জিন দিয়ে পাহাড়ি রুটে আন্তনগর ট্রেন চালানো নিছক ঝুঁকি নয়, এটি যাত্রী নিরাপত্তার সঙ্গে খেলা।
সিলেট অঞ্চলে যাত্রীর চাহিদা বেশি, আন্তনগর ট্রেন তুলনামূলক কম। তার ওপর পুরোনো ইঞ্জিনের এই দুরবস্থা পুরো ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। যাত্রীদের ভোগান্তি যেন রেলের কাছে পরিসংখ্যান মাত্র। অথচ প্রতিটি বিলম্ব, প্রতিটি বিকল ইঞ্জিন, প্রতিটি রাতের আতঙ্ক—রেল কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার জীবন্ত প্রমাণ।
এখন প্রশ্ন একটাই—আর কতবার লাউয়াছড়ার বনে ট্রেন থামলে রেল কর্তৃপক্ষ জেগে উঠবে? নাকি রাজস্বের হিসাব নেবে, কিন্তু যাত্রী সুরক্ষা ও সেবার প্রশ্নে একই অবহেলা চলবে? সিলেট রুটের যাত্রীরা উত্তর চান, আশ্বাস নয়।
-পতাকানিউজ/এমআরআর

