লামা। পার্বত্যজেলা বান্দরবানের সবুজ অরণ্যরাজ্য। সেখানেই দিগন্তজোড়া সবুজের বুক জুড়ে ছড়িয়ে আছে হলুদের উচ্ছ্বাস। যেন প্রকৃতি নিজেই রঙতুলিতে আঁকছে এক অনন্য ক্যানভাস।
পাহাড়ি উপজেলা লামার গ্রামীণ পথ ধরে এগোলেই চোখে পড়ে সারি সারি সূর্যমুখীর বাগান—দূর থেকে মনে হয়, সবুজের উপর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে এক টুকরো হলুদ চাদর। পাখির চোখে তাকালেও যেন এই সুন্দরের শেষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সূর্যের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো ফুল যেন একসঙ্গে হাসছে, আর সেই হাসিই ছড়িয়ে পড়ছে কৃষকের মুখে।
সূর্যমুখী—নামেই যার পরিচয়। সূর্যের দিকে মুখ করে ফুটে ওঠে বলেই এ নাম। তবে সৌন্দর্যের গণ্ডি পেরিয়ে এটি এখন সম্ভাবনার আরেক নাম। এর বীজ একটি গুরুত্বপূর্ণ তেলজাতীয় ফসল। শুধু তেল নয়, কাঁচা বা হালকা শুকনো বীজ ভেজে খাওয়া যায়, সালাদ, দই, কিংবা ওটসের সঙ্গে মিশিয়েও এর ব্যবহার জনপ্রিয়। গুঁড়ো করে স্যুপে দেওয়া যায়, বেকিংয়ে যোগ করা যায়, এমনকি ঘরেই তৈরি করা যায় স্বাস্থ্যকর বাটার। তবু বিশ্বজুড়ে সূর্যমুখীর আসল পরিচয়—পুষ্টিগুণে ভরপুর তেল।
এ বছর বান্দরবানের লামায় দৃশ্যপট বদলেছে চোখে পড়ার মতো। বহু কৃষক তামাকের চাষ ছেড়ে সূর্যমুখীর দিকে ঝুঁকেছেন। দীর্ঘদিনের তামাক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে বিকল্প ফসলের দিকে এগিয়ে যেতে কৃষকদের উৎসাহিত করছে সরকারও। সরকারি প্রণোদনার আওতায় উপজেলায় ৫ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে। ফলন আশাব্যঞ্জক হওয়ায় কৃষকদের চোখে এখন নতুন স্বপ্নের আলো।
কৃষকের পাশে সরকার
লামা কৃষি অফিস জানায়, ভাদ্র-আশ্বিন—অর্থাৎ মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য অক্টোবর—সূর্যমুখী চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। জমি ভালোভাবে প্রস্তুত করতে ৪–৫ বার আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করতে হয়। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বীজ বপন, প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ এবং সময়মতো পরিচর্যার মধ্য দিয়ে ৯০ থেকে ১০৫ দিনের মধ্যেই ঘরে ওঠে ফসল। বিঘা প্রতি ৭ থেকে ১০ মণ ফলনের সম্ভাবনা থাকায় এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের বাজারে প্রতি কেজি সূর্যমুখী বীজের দাম ৫০০ থেকে ১,৩০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে, যা বীজের ধরন ও মানের ওপর নির্ভরশীল।

উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা অভিজিৎ বড়ুয়া জানান, ৪০ জন কৃষককে এক বিঘা জমির পরিমাণ করে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। পৌর এলাকা থেকে শুরু করে গজালিয়া, সদর, রূপসীপাড়া, ফাঁসিয়াখালী, আজিজনগর ও ফাইতং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জমিতে এখন সূর্যমুখীর মৌসুম। আর কয়েক দিনের মধ্যেই ফসল ঘরে তুলবেন কৃষকেরা। মাঠের ফলন দেখে তিনি আশাবাদী—খরচ পুষিয়ে ভালো লাভ পাবেন চাষিরা।
৪০ জন কৃষককে এক বিঘা জমির পরিমাণ করে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। পৌর এলাকা থেকে শুরু করে গজালিয়া, সদর, রূপসীপাড়া, ফাঁসিয়াখালী, আজিজনগর ও ফাইতং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জমিতে এখন সূর্যমুখীর মৌসুম।
লামা পৌরসভার ছাগলখাইয়া এলাকা যেন এই পরিবর্তনের জীবন্ত উদাহরণ। লামা–আলীকদম সড়কের পাশ ঘেঁষে বিস্তৃত সূর্যমুখীর বাগান চোখে পড়তেই থমকে দাঁড়াতে হয়।
প্রতিটি গাছে বড় বড় হলুদ ফুল, সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা তাদের একাগ্রতা যেন প্রকৃতির সঙ্গে নীরব কথোপকথন। দূর থেকে পুরো এলাকা দেখে মনে হয়, যেন হলুদের সমুদ্রে ডুবে আছে পাহাড়ি সবুজ।
এই বাগানের মালিক ছাগলখাইয়া মৌজার হেডম্যান মংক্যচিং মার্মা। প্রথমবারের মতো ৪০ শতক জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন তিনি। কৃষি অফিস থেকে বীজ সংগ্রহ করে ডিসেম্বরের শেষ দিকে বপন করেছিলেন বীজ। এখন সেই জমিতে ফুটে উঠেছে বড় বড় তরতাজা ফুল। ফুলের দিকে তাকিয়ে তার মুখে ফুটেছে তৃপ্তির হাসি।
এ পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে ১০ হাজার টাকা; ফসল ঘরে তুলতে আরও প্রায় ৫ হাজার টাকা লাগবে। সব মিলিয়ে ১৫ হাজার টাকা বিনিয়োগে ১৫ থেকে ২০ মণ ফলনের আশা করছেন তিনি। কাঁচা খোসাযুক্ত বীজ প্রতি কেজি ২০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও খরচ বাদে লক্ষাধিক টাকা লাভের স্বপ্ন দেখছেন এই কৃষক।
একই দৃশ্য গজালিয়া ইউনিয়নের গতিরাম পাড়াতেও। সজারাম ত্রিপুরা নামের এক তরুণ কৃষক কৃষি বিভাগের পরামর্শে ১০ শতক জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তার জমিতেও প্রতিটি গাছের মাথায় ফুটেছে বড় বড় হলুদ ফুল। নিজের ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “এমন ফলন আগে পাইনি।” তার চোখে এখন নতুন আশার ঝিলিক।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, সূর্যমুখীর তেল পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা বাড়ছে। এ বছর প্রণোদনার আওতায় ৪০ জন কৃষককে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। আবাদকৃত জমি পরিদর্শনে দেখা গেছে, ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। তার প্রত্যাশা—এই সফলতা আগামী বছর আরও বেশি কৃষককে সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী করবে।
পাহাড়ি জনপদের মাঠে তাই এখন সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে নতুন সম্ভাবনা। সূর্যমুখীর হলুদ পাপড়ি যেন শুধু মাঠই নয়, বদলে দিচ্ছে কৃষকের জীবন ও স্বপ্নের রঙও। এখানে প্রতিটি ফুটন্ত ফুল একেকটি আশার গল্প—যেখানে প্রকৃতি, পরিশ্রম আর সম্ভাবনা মিলেমিশে লিখছে নতুন দিনের গল্প।
-পতাকানিউজ/এমজেসি

